Templates by BIGtheme NET
১৩ জুন, ২০১৯ ইং, ৩০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ৯ শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী

জঙ্গিবাদ ও বাংলাদেশ

প্রকাশের সময়: মে ১১, ২০১৯, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ

ফারজানা মাহমুদ 

সমাজের বৃহত্তর অংশকে উপেক্ষা করে যারা বিভিন্ন কারণে সহিংসতা প্রচার করে বা সহিংস আক্রমণ চালায়, তারাই জঙ্গি। ধর্মের নামে, ধর্মের অপব্যবহার করে জঙ্গিরা বিশ্বব্যাপী নিরীহ মানুষের ওপর যে বর্বরতা চালাচ্ছে তা চরম নিন্দনীয়। বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের জন্যও জঙ্গিবাদ একটি প্রকট সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যদিও বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে অসাম্প্রদায়িক চেতনায়, কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর স্বৈরশাসকরা বিভিন্ন পর্যায়ে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে গিয়ে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিয়েছে, সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তিকে উসকানি দিয়েছে। যা আমাদের বহুকালের লালিত অসাম্প্রদায়িক ও সহিষ্ণুতার সংস্কৃতিকে করেছে দুর্বল। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মেজর জিয়া ১৯৭২ সালের সংবিধানসহ রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং সামাজিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। যার ফলে জামায়াতের মতো রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতিতে সক্রিয় হয় এবং জঙ্গিবাদের সূচনা করে।

বিগত কয়েক দশকে আমরা দেখেছি কীভাবে বিএনপি, জামায়াত এবং এর অঙ্গসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির ধর্মান্ধতাকে উসকানি দিয়েছে, ধর্মের নামে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করেছে। বিএনপির শাসনামলে বাংলাভাই, শায়খ আবদুর রহমানদের জন্ম হয়েছে। তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে নারকীয়তা চালিয়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ সাধারণ মানুষের ওপর, ঘটিয়েছে নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের বোমা হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান, দেশের বিভিন স্থানে বোমা হামলা এবং নিরীহ মানুষের ওপর আক্রমণ ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে মদত দিয়েছে। ২০০৫ সালে জঙ্গিরা দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালায়। সাম্প্রদায়িকতার উসকানিতে ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর চালানো হয়েছে নির্মম অত্যাচার। সাম্প্রদায়িক আক্রমণের আড়ালে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তি দেশকে একটি অকার্যকর জঙ্গিরাষ্ট্রে পরিণত করার পরিকল্পনায় ছিল লিপ্ত।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয় এবং নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি-জামায়াতচক্র জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ আপামর জনগণের ওপর চালিয়েছে নির্মম আক্রমণ, পুড়িয়েছে মানুষ-যানবাহন। এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দেশের অভ্যন্তরে জঙ্গিবাদকে লালন করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তরুণ-তরুণীদের ব্যবহার করা হয়েছে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে। লক্ষণীয় যে, সম্প্রতি সংগঠিত জঙ্গি হামলাগুলোতে ধনী-শিক্ষিত পরিবারের ছেলেমেয়েদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এসব তরুণ বাংলাদেশের সংস্কৃতি, সমৃদ্ধ ইতিহাস, শতবর্ষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ঐতিহ্য সম্পর্কে অবগত নয় বলেই হিজবুত তাহরিরের মতো উগ্র জঙ্গি সংগঠনগুলো এদের সহজেই বিপথে চালিত করতে পারে।

সম্প্রতি আমরা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান দেখেছি। ধর্মীয় উন্মাদনায় হলি আর্টিজানে নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, ব্লগার-লেখক-প্রকাশকদের ওপর আক্রমণ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ধর্মযাজকদের ওপর হয়েছে আক্রমণ। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে অসংখ্য জঙ্গি এবং জব্দ হয়েছে প্রচুর গোলাবারুদ।

দুঃখজনক হলেও সত্য, গ্রেফতারকৃত জঙ্গিদের প্রায় সবাই বিএনপি বা জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০১৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর পুলিশি অভিযানের সময় একজন কুখ্যাত জঙ্গির স্ত্রী নিজেকে বোমা দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ সিলেটে পুলিশি অভিযানের সময় দুজন মহিলাকে কোমরে বোমা বাঁধা অবস্থায় গ্রেফতার করা হয়, যা প্রমাণ করে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আমাদের নারীরাও জড়িয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাসী সংগঠন, যেমন- আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, হিযবুত তাহরির বা নব্য জেএমবি’র বাংলাদেশ প্রোফাইল পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, আমাদের দেশের অভ্যন্তরে জঙ্গিরা সক্রিয় আছে এবং তাদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগও রয়েছে। এসব জঙ্গি সংগঠন আমাদের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বিশাল হুমকি।

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বদ্ধপরিকর। সন্ত্রাস দমনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে সন্ত্রাস দমন আইন প্রণয়ন করে। বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সন্ত্রাস মোকাবিলার জন্য ২০১২ এবং ২০১৩ সালে এই আইনটির সংশোধন করা হয়। জননেত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধের জন্য প্রণয়ন করা হয় অর্থপাচার আইন ২০১২। এছাড়া অন্যান্য দেশের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রণয়ন করা হয় পারস্পরিক ফৌজদারি সহায়তা আইন বা Mutual Legal Assistance in Criminal Matters Act ২০১২। জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সব ধর্মের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং লাখো অনগ্রসর কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের সমাজের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করার জন্য কওমি শিক্ষা ব্যবস্থাকে দেওয়া হয়েছে স্বীকৃতি।

সন্ত্রাসীদের কোনও ধর্ম নেই। ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইসলাম জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা হত্যাকাণ্ড সমর্থন করে না।

ইসলাম ধর্মে ধর্ম নিয়ে জোর জবরদস্তি না করার কথা বলা হয়েছে, অন্য ধর্মকে সম্মান প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে। একজন প্রকৃত মুসলিম, প্রকৃত ধার্মিক কখনো নিরীহ মানুষদের হত্যা করতে পারে না। কিন্তু আমরা দেখছি, সমগ্র বিশ্বে এমনকি আমাদের দেশের কিছুসংখ্যক ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদকে উসকে দিচ্ছে, যা কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য প্রাণ। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে যুব সমাজকে বিপথে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র আমাদের সমৃদ্ধি ও শান্তির পথে অন্তরায়।

ধর্মের অপব্যাখ্যা রোধে আলেম-ওলামাদের এগিয়ে আসতে হবে। এরই আলোকে প্রত্যেক ধর্মের ধর্মগুরুদের এগিয়ে আসতে হবে, তাদের একযোগে কাজ করতে হবে ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা প্রদানে এবং আমাদের যুব সমাজকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের ভয়াবহতার কথা বোঝাতে হবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মপ্রাণ, তাদের ধর্মীয় অনভূতিতে আঘাত দিয়ে কেউ যেন কোনও ফয়দা না নিতে পারে তার জন্য আমাদের সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সকল ধর্ম ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, সহিষ্ণুতার প্রচার ও প্রসার ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের আলেম সমাজ, ধর্মীয় গুরু, নাগরিক সমাজ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যমগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে।

বিভিন্ন ধর্মের-বর্ণের তরুণ-তরুণীদের বোঝাতে হবে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির গুরুত্ব এবং জঙ্গিবাদের কুফল। তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীরা যেন কোনও প্রকার প্রলোভনে না পড়ে কিংবা বিপথে চলে না যায় সে ব্যাপারে শিক্ষকরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। প্রয়োজনে জঙ্গিবাদ রোধকল্পে শিক্ষক ও আলেম সমাজকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কারণ, তারাই আমাদের তরুণ সমাজকে সুপথে পরিচালিত করতে বিশাল ভূমিকা রাখেন।

কোমলমতি শিক্ষার্থী ও তরুণদের ভুল বুঝিয়ে কিংবা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসকে শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্টের হাতিয়ার না বানাতে পারে তার জন্য প্রতিটি স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দিয়ে কাউন্সেলিংয়ে সুযোগ করে দিতে হবে। তরুণ সমাজকে আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সঙ্গে একাত্ম করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
জঙ্গিবাদকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে এর নির্মূলে প্রস্তুত হতে হবে এবং সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় এটিকে দমন করতে হবে। আধুনিকায়নের যুগে অপরাধের ধরন পাল্টেছে, পাল্টেছে জঙ্গি আক্রমণের কৌশল, তাই এর মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনে আরও দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রত্যেক মা-বাবাকে সচেতন হতে হবে তাদের সন্তানদের ব্যাপারে। আমাদের বৃহত্তর নারীসমাজকে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্পৃক্ত করতে হবে। জঙ্গিবাদের অর্থায়নের উৎস ও মদতদাতাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে বিরাজমান আইনের সংশোধন করতে হবে। নিজেদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন ধর্মের অপব্যবহার করে বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহার করে কোনও ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা জঙ্গিবাদকে উসকানি দিতে না পারে, তার জন্য আমাদের একযোগে কাজ করতে হবে।

এই দেশ আমাদের সকলের প্রিয়, লাখো শহীদের রক্ত ও সম্মানের বিনিময়ে পাওয়া। এর সার্বভৌমত্ব ও জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায়। মানবতার বিরুদ্ধে যে জঙ্গিবাদ- তা নিপাত যাক, এই হোক আমাদের দৃঢ় প্রত্যয়।

লেখক: আইনজীবী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

fifteen − 12 =