Templates by BIGtheme NET
৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ২৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১০ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী
?

ইতিহাস বিকৃতিকারীদের কি শাস্তি হবে না?

প্রকাশের সময়: জুন ১২, ২০১৯, ৮:৫৬ অপরাহ্ণ

লীনা পারভীন :

লীনা পারভীনপৃথিবীর বুকে আর দ্বিতীয় কোনও দেশ পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ–যারা নিজ দেশের ইতিহাস নিয়ে এমন কাটাছেঁড়া করতে পারে বা যেমন খুশি তেমন বানাতে পারে। আমরা দেখেছি ১৯৭১ সালে জন্ম নেওয়া এই দেশটির ইতিহাসকে কেমন করে বিকৃত করেছে ’৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর একের পর এক স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ক্ষমতায় এসেছে নানা কায়দায়। তারা এসেই প্রথমে হাত দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে গল্প-উপন্যাস, সিনেমা সব জায়গাতেই ছিল অসত্য তথ্যের সমাবেশ। ’৭৫ থেকে এই পর্যন্ত একটা প্রজন্ম বেড়ে উঠছে ভুল আর বিভ্রান্তিকর তথ্য জেনে। এদের কাছে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটিকে হালকা করে দেওয়ার প্রচেষ্টাও কম হয়নি। এ চেষ্টারই ধারাবাহিকতা আবারও আমরা দেখেছিলাম ২০১৪ সালে প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এ কে খন্দকারের বইয়ে। ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইয়ের ৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় এ কে খন্দকার বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভাষণে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে–তা তিনি মনে করেন না। রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’ বলে ভাষণ শেষ করেছিলেন বলেও তিনি বইয়ে উল্লেখ করেন। ৭ মার্চের ভাষণ, যা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের ঘোষণা, যে ভাষণের জন্য আজ আমরা একটি স্বাধীন জাতি, সেই ভাষণ নিয়ে এমন অসত্য তথ্য উপস্থাপন করা কোন মাত্রার অপরাধ, সেটি নিশ্চয় কোনও বাঙালিকে বুঝানোর অবকাশ নেই।

ইতোমধ্যে আমরা জানি ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কয়েকটি ভাষণের একটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই ভাষণের রেকর্ড সংরক্ষিত আছে, আছে তৎকালীন সময়ে ছাপা পত্রিকার কপি। এখনও অনেক মানুষ জীবিত আছেন, যারা সেইদিন রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলেন এবং তারা কেউ ভুলে যাননি সেই ১৯ মিনিটের আগুন ঝরানো বক্তৃতার একটি শব্দও। অথচ একটি গোষ্ঠী অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে এখনও চেষ্টা করে যাচ্ছে শেখ মুজিবের ভূমিকাকে বিতর্কিত করে যেতে। বিচারপতি হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি শামসুর রাহমানও একই কথা বলেছিলেন। যদিও তারা পরবর্তী সময়ে নিজেদের বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। এবারও ক্ষমা চাইলেন মুক্তিযুদ্ধের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ, সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী এ কে খন্দকার। অথচ বইটি প্রথম প্রকাশ হয়েছে ২০১৪ সালে। গত চার বছরে বইটির কয়েকটি সংস্করণও হয়ে গেছে। অর্থাৎ বইটি অসত্য তথ্য নিয়ে পৌঁছে গেছে সমাজের অনেক মানুষের হাতে। একটি বই মানে একটি দলিল। ভবিষ্যতের রেফারেন্স। আর বইটি যদি হয় মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাসবিষয়ক, তাহলে এর মূল্য থাকে অনেক বেশি। দেরিতে হলেও এ কে খন্দকার ভুল তথ্যটির জন্য সংবাদ সম্মেলন করে ক্ষমা চাইলেন।

কিন্তু এই অপরাধ কি ক্ষমার যোগ্য? এখানে আরেকটি ভয়ঙ্কর দিকও উঠে এসেছে। ওই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এ কে খন্দকারের স্ত্রী ফরিদা খন্দকার। তার বক্তব্য থেকেই জানা যায়, কিছু লোক বইটি যেন সংশোধন করা না হয় সেজন্য চাপে রেখেছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির নামও তিনি বলেন সংবাদ সম্মেলনে। এ কে খন্দকারের স্ত্রী ফরিদা খন্দকার সংবাদ সম্মেলনে যাদের নাম উল্লেখ করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যমেও যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন তাজউদ্দীন আহমদের পিএস মঈদুল হাসান ( মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে লেখা মূলধারা ৭১ বইয়ের লেখক), ডা. জাফরুল্লাহসহ আরও কিছু সুপরিচিত ব্যক্তিদের নাম। ফরিদা খন্দকার আরও বলেছেন, ‘তারা বেশ কিছুদিন পাহারা দিয়ে রেখেছিল যেন সংশোধন করতে না পারি।’ এই ঘটনার ভয়াবহতা আমাদের অত্যন্ত ব্যথিত ও অবাক করে। তারাই তো অনেক সময় সামাজিক মতামত গঠনে ভূমিকা রাখেন।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কারও ইচ্ছেঘুড়ি হতে পারে না। এর প্রতি থাকতে হবে সকল মানুষের সমান দায়িত্ব। সে দায়িত্বের জায়গা থেকে এই ঐতিহাসিক ও অমার্জনীয় ভুলের দায় কি তারা এড়াতে পারবেন? লেখক হিসেবে এ কে খন্দকার সাহেব ক্ষমা চেয়েছেন। ক্ষমা চাইলেই কি ক্ষমা পাওয়া যায়? তিনি তো একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের লড়াইকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাহলে তিনি যখন কোনও ইতিহাস লিখবেন সেটিও তো খুবই গুরুত্বসহকারে নেওয়া হবে। সেখানে ভুল কেমন করে মেনে নেওয়া যায়? অতীতে যারা এ ভুল করে ক্ষমা পেয়েছেন, তাদের নিয়ে কিছু বলার নেই, কারণ সেই দু’জন এখন আর বেঁচে নেই। তবে ইতিহাস কি তাদের ক্ষমা করবে?

বইটি প্রথমা প্রকাশন প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে। এতেই কি তাদের অপরাধের পাল্লা হাল্কা হয়ে যাবে? ইতোমধ্যে যে কয়টি সংস্করণ বাজারে এসেছে এবং সেসব বইয়ের ক্রেতা ও পাঠক যে ভুল তথ্যকেই সঠিক বলে জানলো, সেই ভুলের মার্জনা কেমন করে হবে? ভবিষ্যতে আমাদের প্রজন্ম যখন রেফারেন্স দেবে এই বইয়ের, তখন কি তারা ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা মনে রেখে কথা বলবে?

এদেশ স্বাধীন, এখানে বাকস্বাধীনতা সর্বোচ্চ স্তরে আছে বলেই আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু স্বাধীনতার এমন অপব্যবহারকেও যদি মেনে নেওয়া হয়, তাহলে বলতে হবে এদেশে সুশাসন কখনই কায়েম হবে না।

বিশেষ করে যখন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া দল ক্ষমতায় আছে, যাদের ইশতেহারে লেখা আছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার সংকল্প। তারা কেন এই বিকৃতিকে মাফ করে দেবে? কিছু দায় ঐতিহাসিকভাবেই রয়ে যায়। সেই দায় মেটানোর কাজটি করতে হয় নিয়মমাফিক, যেখানে কারও ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা ভালো লাগার কোনও সুযোগ থাকা উচিত না।

তাই, সরকারের কাছে জোর দাবি করছি, যারাই ইতিহাস বিকৃতি করার চেষ্টা করবে, ইতিহাস নিয়ে অসত্য তথ্য উপস্থাপন করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। কারণ তাদের রুখে না দিলে জাতির কপালে কলঙ্কের দাগ থেকে যাবে চিরকালের মতো। অতিসত্বর ইতিহাস বিকৃতিকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। জাতির মেরুদণ্ডে আঘাত করে দুর্বল করে দেওয়ার পর প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলে বা বই তুলে নিলেই সব সমস্যার সমাধান চলে আসে না। এ ষড়যন্ত্রের বীজ আরও অনেক গভীর বলেই মনে করি। তাই উপড়ে ফেলতে হবে গোড়াসহ।

লেখক: কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

12 + 14 =