Templates by BIGtheme NET
২১ আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৬ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৯ জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

আমি পিতাকে ভুলতে চাই না

প্রকাশের সময়: আগস্ট ৮, ২০১৯, ৮:৩৮ অপরাহ্ণ

শোকের মাস আবার কী জিনিস?

একজন ব্যক্তির প্রয়াণ দিবস নিয়ে এত মাতম করার কী আছে?

এদিনটাতে আমার কেন মন খারাপ করে থাকতে হবে?

এদিন নিয়ে এত আলোচনার কী আছে?

আগস্ট মাসে এসব প্রশ্ন কিংবা মন্তব্য কিন্তু নতুন নয়। ১৯৭৫-এর পরের যে প্রজন্ম, তাদের জন্য এই ভ্রান্তি নতুন বা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। আমি নিজে আওয়ামী পরিবারের সন্তান হবার পরও একেকটা সময় এই ধরনের ভ্রান্তির ভেতর দিয়েই যেতে হয়েছে। আর এই ভ্রান্তির কারণ অনুসন্ধানে বেরিয়ে জানাও হয়েছে অনেক কিছু।

কী জানলাম?

জানলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হবার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এই ব্যক্তিটির প্রতিটি কাজ, পরিকল্পনা ছিল বৈশ্বিক।

আজকাল আমরা প্রায়ই রাজনৈতিক নেতৃত্বে শূন্যতার কথা বলি। সরকারি, বেসরকারি নানা ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা সংকটের কথা বলি, পড়ি। কিন্তু এটা মনে করি না, এর কারণ কী? উন্নত দেশগুলো তাদের ব্যবস্থাপনার নানা ক্ষেত্রে নিপুণতা বাড়াবার জন্য প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন। স্বপ্নবাজদের নিয়ে আসেন গল্প শোনাবার জন্য, যাকে হালে আমরা মোটিভেশনাল স্পিচ বলি। একবারও কি ভেবেছি, আমরা একজন বিশ্বমানের মোটিভেশনাল স্পিকারকে হারিয়েছি? যিনি এক পরিবার, একটি গোত্র বা একটি ছোট সমাজ নয়, বক্তৃতা দিয়ে পুরো একটি জাতির চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারতেন?

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনাই শুধু নয়, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও রাখতে পেরেছেন অবিশ্বাস্য দক্ষতা? একজন ব্যক্তির পরিকল্পনাতেই সবকিছু হলো। ৯ মাসের যুদ্ধে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড। জিও-পলিটিক্যাল কূটনীতি আছে জেনেও বৃহৎ প্রতিবেশীর সেনাদের বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করা। সে সময়ের সবচেয়ে আধুনিক সমরাস্ত্র সংগ্রহ করে সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীগুলোকে আধুনিক রূপ দেয়। বৈশ্বিক নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করার অভিপ্রায়ে যুক্ত হয়েছিলেন নানা বিশ্ব ফোরামে। সে সময়ে তাঁর পাওয়া সম্মানের নানা নিউজ ক্লিপ আজও পাওয়া যায় ইন্টারনেটে। বঙ্গবন্ধু তাঁর অল্প সময়ে কী কী করেছেন আর কী কী করতে সফলতা দেখাতে পারেননি, তা নিয়ে এই নোট নয়। সেটি নিয়ে আরেক সময় সিরিজ লিখব। শুধু এটুকু বলতে পারি, এই সময়ে বঙ্গবন্ধু যা করে দেখিয়েছেন, তাঁর পরের সময়ে বৈধ, অবৈধ কোনো শাসক বা সরকারই তার ধারে-কাছে যেতে পারেননি।

একটু মূল আলোচনায় আসি। এ মাসে বারবার শোক, শোক বলে চিৎকারের কারণ কী?

ধরুন, আপনার বাবা মারা যাননি, আপনি তার কু-সন্তান, নিজেই নিজের জন্মদাতাকে মেরে ফেললেন। কাজটি করলেনও নিজে পরিণত হবার আগেই। ধরুন, আপনার কিশোর বয়সে। তার মানে তখনও আপনি বড় হবার জন্য দরকারি অনেক কিছুই শেখেননি আপনার বাবার কাছ থেকে। এবং এরপরও আপনি আশা করবেন যে জীবনের নানা ক্ষেত্রে আপনি সফলতার মুখ দেখবেন, উন্নতি করবেন। এটা কি সম্ভব? সম্ভব না। আর এ কারণেই সামরিক শাসনের কূপমুণ্ডকতার যুগে আমাদের মুখ ডুবিয়ে থাকতে হয়েছে, সেখান থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে অগ্রযাত্রা শুরু করেও ‘গণতন্ত্র’ শব্দটার নানা অপব্যাখ্যায় আবারও আন্দোলন করি, মানুষ মারি, নিজে মরি এবং আবারও দোষ দেই ‘শূন্যতার’।

এই শূন্যতা আসলে অন্য কিছু নয়। এটি একজন সু-অভিভাবকের শূন্যতা। আমরা তাকে হারিয়েছি। পৃথিবীতে কোনো শূন্যতায় কোনো কিছুই থেমে থাকে না। আমরাও থেমে থাকিনি। কিন্তু ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে হেঁটেছি। এখন সময় নবযাত্রার। যে অভিভাবককে আমরা হারিয়েছি, তারই উত্তরাধিকার শেখ হাসিনার অভিযাত্রায় আমরা আবারও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। ভঙ্গুর পা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে শিখেছি। কিন্তু যে পিতাকে আমরা হারিয়েছি, তার জন্য কাঁদতে যে হবেই। কাঁদব কারণ, আমরা নিজেকে পিছিয়ে দিয়েছি। কাঁদব কারণ, আমরা আমাদের অভিভাবককে খুন করেছি।

এটি কেবল এক মাসের শোক নয়, এটি সারা জীবনের শোক। পিতার প্রয়াণ দিবস নিয়ে মাতম করার কিছু নেই, হয়তো সত্যিই নেই। তবে ভাববার, স্মরণ করার অনেক কিছুই আছে। জাপানিরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কী করেছে, আর কী পরিণতিতে কী পেয়েছে, তা স্মরণ করে বলেই তারা বিনয়ী হয়েছে, উন্নতিতে মনোনিবেশ করে সফলতা পেয়েছে। এদিনটিতে মন খারাপ করতে হবে। কারণ, আমরা একটি জীবন্ত স্বপ্নকে হারিয়েছি। আলোচনা করতেই হবে কারণ, এমন ভুল যেন আর কেউ কখনো না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ পাপের প্রায়শ্চিত্ব হয় না, হবে না। তবে পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলার কিছুটাও যদি পূরণে আমি, আপনি ভূমিকা রাখি, মহান আল্লাহর কৃপায় হয়তো তার আত্মা একটু শান্তি পাবে। পরম করুণাময় তাকে জান্নাতের সুশীতল ছায়ায় পরকালের পুরোটা সময় দয়া করুন।

লেখক: তাহেরুল হাসান শিবলী

সদস্য সংস্কৃতিক উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

10 + 17 =