Templates by BIGtheme NET
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৩১ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৫ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী

সামিল হতে চাই বেহেস্তি সর্দারের কাফেলায়

প্রকাশের সময়: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৯, ৯:৫৯ পূর্বাহ্ণ

হৃদয়ের চিরস্থায়ী এক ক্ষতের নাম কারবালা। ইতিহাসের জঘন্যতম এ হত্যাকাণ্ডের ক্ষত কখনও শুকাবে না। কারবালা প্রান্তরে নবী দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.) ও আহলে বায়েতদের শাহাদত ইতিহাসের নিকৃষ্টতম হত্যাকাণ্ড।

কিন্তু এ হত্যাকাণ্ডের মূল হোতাদের দায়মুক্ত করতে অনেকেই কসরত করেন। ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে চান এ হত্যাকাণ্ডে ইয়াজিদকে জড়ানো উচিত নয়। তার আদেশ ছাড়াই ইবনে জিয়াদ এ হত্যা ঘটিয়েছে। অনেকেই এ ধরনের চিন্তাকে ওলামায়ে দেওবন্দের মতাদর্শ বলেও প্রচার করে।

কিন্তু ওলামায়ে দেওবন্দের কোনো বক্তব্য ও লেখনীতে এমন তথ্য পাওয়া যায় না। বরং ইতিহাসের বেদনাদায়ক এ কর্মের জন্য সবাই ইয়াজিদকে দায়ী করেছেন। কারণ কারবালা প্রান্তরে ঘটে যাওয়া হৃদয়বিদারক ঘটনাটি শুধু ১০ মহররম সংঘটিত একটি দুর্ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে নবী পরিবার ও সত্যান্বেষী সাহাবাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত কর্মকাণ্ডের চূড়ান্ত ধাপ এ নৃশংস হত্যাযজ্ঞ।

মাওলানা ইউসুফ লুধীয়ানভী (রহ.) লেখেন, ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সর্বমত সিদ্ধান্ত হল তৎকালীন হজরত হুসাইন (রা.)-এর প্রতিটি পদক্ষেপই সঠিক ছিল। তার বিপরীতে ইয়াজিদের কর্মকাণ্ডকে কোনোভাবেই হক বলা যাবে না। তাই ইয়াজিদকে আমিরুল মুমিনীন বলা নিষেধ। কেউ যদি বলে হজরত হুসাইন (রা.) শাসকের সঙ্গে বিদ্রোহ করেছেন, তাহলে সে আহলে সুন্নাতের আকিদার সঙ্গেই বিদ্রোহ করল।

একাধিক সহি হাদিসে রাসূল (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘হাসান- হোসাইন এ দুজন জান্নাতে যুবকদের সরদার হবেন। যারা হজরত হুসাইন (রা.) কে বিদ্রোহী সাব্যস্ত করতে চায়, তারা এ সরদারের নেতৃত্বে কীভাবে জান্নাতে যাওয়ার আশা করে? আমরা যদি ইতিহাসের সত্যপাঠ গ্রহণ করি তাহলে দেখতে পাব যে, হজরত হুসাইন (রা.)-এর সংগ্রাম নিছক ক্ষমতাকেন্দ্রিক ছিল না। রাজসিংহাসন দখলের ন্যূনতম আগ্রহ থেকেও তিনি মুক্ত ছিলেন।

রাসূল (সা.)-এর ঐশী আদর্শ যেভাবে রাষ্ট্রীয় প্রভাবে মুছে ফেলার আয়োজন চলছিল, সে পরিস্থিতিতে খেলাফতে রাশেদার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যই ইমাম হোসাইন (রা.) দাঁড়িয়েছিলেন। আর তিনি যদি খেলাফত প্রাপ্তির আশায় দাঁড়িয়ে থাকেন তাহলে তার এই আশাও যথাযথ ছিল। বাস্তবে তিনিই ছিলেন সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি ও উম্মাহর আশা-আকাক্সক্ষার শেষ স্থল।

ইয়াজিদ সাহাবিপুত্র, তাই তার কোনো ভুল ধরা যাবে না, বা তার ভুলগুলোকে ব্যাখ্যা করে শুদ্ধ করতে হবে অনেকের এমন মনোভাব দেখা যায়। হজরত হোসাইন (রা.) ও আহলে বায়েতের হত্যা, মদিনায় গণহত্যা এবং কাবা শরিফে পাথর নিক্ষেপের গর্হিত কাজকে তারা কীভাবে বৈধতা দিতে পারেন। হজরত হোসাইনকে ইবনে জিয়াদ হত্যা করেছে, তাই এর কোনো দায়ভার ইয়াজিদের ওপর বর্তায় না। এমন দাবি করা মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়।

কারণ হোসাইন (রা.) মোকাবেলার জন্যই তো ইবনে জিয়াদকে কুফার গভর্নর বানানো হয়েছিল। ইয়াজিদের গভর্নর ইবনে জিয়াদ হোসাইন (রা.)-এর প্রতিনিধি মুসলিম ইবনে আকিল ও হানি ইবনে উরওয়াকে হত্যা করে, দুজনের মাথা ইয়াজিদের কাছে পাঠানো হলে সে খুশি হয়ে হোসাইন (রা.)-এর প্রতি আরও কঠোর হওয়ার আদেশ দেন। পথে পথে সেনা মোতায়েন করে হোসাইনি কাফেলাকে নির্যাতন করা হয়। পানি বন্ধ করার মতো জাহেলি কাজটুকুও তারা নবী পরিবারের সঙ্গে করে।

হজরত হোসাইন (রা.)কে যখন শহীদ করা হয়, তখন তার পবিত্র শরীরে তরবারির ৩৩টি, বর্শার আঘাত ছিল ৩৩টি। এ ছাড়া অগণিত তীরের আঘাত তো ছিলই। ব্যক্তি ইয়াজিদের অন্যান্য ভালো কাজ হয়তো থাকতে পারে, একজন মানুষের ভালো কাজের জন্য যতটুকু সওয়াব ও মাগফিরাতের কথা বর্ণিত আছে, তা সে পাবে। কিন্তু তাই বলে তার ভুলগুলোকেও কেন শুদ্ধ বলতে হবে। মাগফিরাত তো গুনাহগারের জন্যই। ইয়াজিদের নিকৃষ্ট কাজগুলোর জন্য পূর্ববর্তী সব আলেম তার ওপর লানত করা জায়েজ মনে করতেন।

সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের মতে তার মৃত্যু কুফরির অবস্থায় হয়েছে কিনা তা যেহেতু নিশ্চিতভাবে জানা যায় না, তাই তার নাম ধরে লানত করা যাবে না। কিন্তু তার স্বৈরাচারিতা ও বর্বরতার কারণে সবাই তাকে লানতযোগ্য মনে করতেন। আহলে সুন্নাতের আকিদায় যেমনভাবে ইয়াজিদের নাম ধরে লানত করা যাবে না তেমনি হজরত হোসাইন (রা.)-এর মোকাবেলায় তার পক্ষপাতিত্ব ও প্রশংসাও করা যাবে না। এজন্য পূর্ববর্তী কোনো আলেম ইয়াজিদের প্রশংসা করেননি। হজরত হোসাইন (রা.), হজরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.)সহ সাহাবা ও তাবেয়িদের যে বিরাট অংশ ইয়াজিদের বিরোধিতা করেছেন, তাদের অবস্থানকেই সবাই সঠিক মনে করেছেন।

আল্লামা ইউসুফ বিননূরী (রহ.) তার বিখ্যাত তিরমিজির ব্যাখ্যাগ্রন্থ মাআরিফুস সুনানে লেখেন, ‘ইয়াজিদের ফাসিকির ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। পূর্বসূরি আলেমরা শুধু তার ওপর লানতের ব্যাপারে মতানৈক্য করেছেন। ইবনে সালাহ লেখেন, ইয়াজিদের ব্যাপারে তিন ধরনের মানুষ দেখা যায়। একটি দল তাকে ভালোবাসে, তার ভুলগুলোকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে। আরেকটি দল শুধু তাকে গালিগালাজই করে। এ দুই প্রান্তিকতার বিপরীত সঠিক দল হল, যারা তাকে ভালো জানে না। তাই বলে শুধু গালাগালও করে না। এ দলটিই সঠিক।

ইউসুফ বিননূরী (রহ.)-এর বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে ইয়াজিদের ফাসিকির ব্যাপারে সবার ইজমা হয়েছে। মুজাদ্দিদে আলফেসানি (রহ.) ইয়াজিদের নামের সঙ্গে অপদার্থ লিখতেন। এ ছাড়া আবদুল হক দেহলভী, শাহ আবদুল আজিজ, কাসেম নানুতুবী, রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহ.) সবাই ইয়াজিদকে গালিদ (নাপাক, দুর্গন্ধযুক্ত) লিখেছেন। আমাদের নির্ভরযোগ্য মুজতাহিদ ও ইমামদের সবাই ইয়াজিদের মাধ্যমে অনাচার ও পাপাচার সংঘটিত হওয়ার বিষয়ে একমত।

ইবনে জিয়াদ যা করেছিল সবই ইয়াজিদের নির্দেশে করেছিল। খুনি ইয়াজিদকে চেনা ও ঘৃণা করার এবং মাজলুম হোসাইনকে জানা ও ভালোবাসার জন্য যে ইমান, যে সততা, যে সাহস, যে দয়া ও মহানুভবতার দরকার, তা সর্বত্র ইয়াজিদি শাসন-শোষণে ক্লান্ত, ভীত ও পাঠবিমুখ জ্ঞানীদের নেই। এভাবেই বিস্মৃত হচ্ছে কারবালার চেতনা। উম্মতের চেতনা থেকে মুছে দেয়া হচ্ছে মাজলুম হোসাইনকে। আল্লাহ আমাদের বেহেস্তি সরদারের কাফেলায় যোগ দেয়ার তাওফিক দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

one × four =