Templates by BIGtheme NET
৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ২৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১০ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু একটি আদর্শের নাম

প্রকাশের সময়: নভেম্বর ৪, ২০১৯, ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু শুধু একটি নামই নয়, একটি আদর্শ। তিনি ছিলেন একজন জনপ্রিয় রাজনীতিক। বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। ছিলেন গরিব-দুঃখী মেহনতি মানুষের পরম বন্ধু। তাঁর আলোয় আলোকিত হয়েছিল সমগ্র চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের রাজনীতি। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু আমৃত্যু আনোয়ারা-কর্ণফুলীর মানুষের পাশে নিজেকে উজাড় করে গেছেন। নীতি-নৈতিকতা ছিল অনন্য সম্পদ। জনগণ ছিল তাঁর পরম আত্মার আত্মীয়, জয় করেছেন তাদের মন, ভালোবাসা।

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু বনেদি ও ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান, একজন দেশ বরেণ্য শিল্পপতি, দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করার পরও নিজেকে একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিল্পপতি হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না, দেশ ও মানুষকে ভালোবাসতেন বিধায় তিনি একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। তাঁর কর্মময় জীবনের ব্যাপ্তি ছিল বিশাল। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। জীবন আমার ধন্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মতো এত বড়মাপের মহৎ হৃদয়বান জাতীয় নেতার সাহচর্য লাভের আমার সুযোগ হয়েছে। তাঁর সেবা করার সুযোগ পেয়েছি।

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু নানা ঝড়-ঝাপটার মাঝেও দলীয় আদর্শে ছিলেন অবিচল, দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন বড় অবলম্বন। শুধু রাজনীতিই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্পায়নের মাধ্যমেও দেশের মাটি ও মানুষের জন্য কাজ করেছেন তিনি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দেশের বেকারত্ব হ্রাসে সহায়তা করেছেন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু বহু বছর ধরে সক্রিয় ছিলেন চট্টগ্রামের রাজনীতিতে। দীর্ঘ সময় ধরে ছিলেন দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন চারবার। নবম জাতীয় সংসদে তিনি ছিলেন পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি। ১৯৪৫ সালে আনোয়ারার হাইলধর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। তাঁর বাবার নাম নুরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি ছিলেন আইনজীবী এবং জমিদার। তাঁর মায়ের নাম খোরশেদা বেগম। তিনি বাংলাদেশের স্বনামধন্য শিল্পপতি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার মরহুম আলহাজ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর দ্বিতীয় কন্যা নূর নাহার জামানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ১৯৫৮ সালে পটিয়া হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ওই বছরই ঢাকা নটর ডেম কলেজে ভর্তি হন। ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে পড়ার সময় তিনি বৃত্তি পেয়ে আমেরিকার ইলিনয় ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ভর্তি হন। পরে তিনি নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে পড়াশোনা করেন। সেখান থেকে অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি নিয়ে ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন। তিনি ১৯৬৫ সালে ব্যবসা শুরু করেন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ১৯৫৮ সালে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ সালে তিনি মূল সংগঠন আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আনোয়ারা ও পশ্চিম পটিয়া থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন আলহাজ আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় তাঁর পাথরঘাটাস্থ জুপিটার হাউস থেকে সংগ্রাম কমিটির কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রামে আসার পর জুপিটার হাউস থেকে সাইকোস্টাইল করে প্রচার করা হয়। তাঁর বাসা থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রসহ সব জায়গায় পাঠানো হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ভারতে যান এবং সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বিশ্বজনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেন। তিনি প্রথমে লন্ডনে যান। সেখান থেকে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে আমেরিকায় যান। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমপিও) হিসেবে আখতারুজ্জামান চৌধুরী ১৯৭২ সালে গঠিত বাংলাদেশ গণপরিষদের সদস্য হন এবং বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। তিনি বাহাত্তর সালের সংবিধানের অন্যতম স্বাক্ষরকারী।

স্বাধীনতার পর ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ২০০৮ সালে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পঁচাত্তর সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং পরবর্তী সময়ে দলের পুনরুজ্জীবন ও পুনর্গঠনে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি কারা নির্যাতন ভোগ করেন। শুধু রাজনীতিই নয়, তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা ছিলেন। স্বাধীনতার আগে তিনি বাটালি রোডে বয়েল ইন্ডাস্ট্রি নামে একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু আসিফ স্টিল মিল, জাভেদ স্টিল মিল, আসিফ সিনথেটিক, প্যানআম বনস্পতি, আফরোজা অয়েল মিল, বেঙ্গল সিনথেটিক প্রডাক্ট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ভ্যানগার্ড স্টিল মিল, সিনথেটিক রেজিন প্রডাক্ট ক্রয় করে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রথম দুই দশকে জামান শিল্পগোষ্ঠীর গোড়াপত্তন করেন। তিনি বিদেশি মালিকানাধীন আরমিট মিল ক্রয় করে সেটিকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করান। বাংলাদেশ বেসরকারি ব্যাংকিং সেক্টর প্রতিষ্ঠায় তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। তিনি দেশে দ্বিতীয় প্রাইভেট ব্যাংক ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের (ইউসিবিএল) উদ্যোক্তা এবং প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। তিনি ২০১১ সালে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পুনর্নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু দেশের ব্যবসায়ীসমাজের মুখপাত্র এবং ব্যবসায়ী নেতা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি দুই দফায় চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং ১৯৮৮ সালে তিনি দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠক এফবিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর চেম্বারের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি ৭৭ জাতি গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি, যিনি এই মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ব্যক্তিজীবনে তিন ছেলে ও তিন কন্যাসন্তানের জনক। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু একজন সমাজ হিতৈষী, দানবীর ও জনদরদি ছিলেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি হাইলধর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। স্বাধীনতার পরেও তিনি হাইলধর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং থানা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও পশ্চিম পটিয়ায় বহু মসজিদ, মাদরাসা ও স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া বহু জনহিতকর কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, তবু তিনি আমাদের অন্তরে চিরজাগ্রত। আজ আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি তাঁর স্মৃতি, অর্থপূর্ণ জীবন ও লালিত মূল্যবোধ। তাঁর আদর্শকে অন্তরে ধারণ করে প্রতিনিয়ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের পথ চলতে হবে। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মতো ত্যাগী নেতার আজ বড়ই প্রয়োজন। তিনি সারা জীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করে গেছেন।

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু প্রমাণ করেছেন মানুষকে ভালোবাসলে, তাদের জন্য কাজ করলে মানুষ তার প্রতিদান দেয়। তাইতো মরেও বেঁচে আছেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। চট্টগ্রাম তাঁর সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়। মৃত্যুর আজ পঞ্চম বছর। তিনি আজ আরো দীপ্তিময়, আরো বেশি জনপ্রিয়।

লেখক : বোরহান উদ্দিন চৌধুরী মুরাদ, সাবেক একান্ত সচিব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

2 × 1 =