Templates by BIGtheme NET
৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ২৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১০ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

ইন্টারনেট ও গণবিক্ষোভ

প্রকাশের সময়: নভেম্বর ১০, ২০১৯, ৬:৪৫ অপরাহ্ণ

বিশ্বব্যাপি গণ বিক্ষোভের সংখ্যা বেড়েই চলছে। ২০১৯ সালের শেষ প্রান্তে এসেও  বৃহত্তম ও সহিংস বিক্ষোভ দেখা যায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। লেবানন, চিলি, স্পেন, হাইতি, ইরাক, সুদান, উগান্ডা, ইন্দোনেশিয়া, ইউক্রেন, পেরু, হং কং, জিম্বাবুয়ে, কলম্বিয়া, ফ্রান্স, তুর্কি, ভেনেজুয়েলা, নেদারল্যান্ডস, ইথিওপিয়া, ব্রাজিল, মালাউ, আলজেরিয়া ও ইকোয়েডরসহ অন্যান্য দেশে বিভিন্ন ইস্যুতে বিক্ষোভ সংগঠিত হয়েছে।

বিক্ষোভ ইতিবাচক ফলাফল বয়ে না আনলেও এই গণ বিক্ষোভের সংবাদ সামাজিক ও গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার কারণে উদ্বেগ তৈরি করে। দ্রব্য মূল্যের দাম বৃদ্ধি করা বা সরকারি ভর্তুকি কমানোই এই প্রতিবাদগুলোর মূল কারণ।

সাম্প্রতিক সময়ে ইকুয়েডরে বিক্ষোভ করেন দেশটির নাগরিকরা। প্রতিবাদের মূল বিষয়বস্তু ছিল জ্বালানীর ভর্তুকি পুনরুদ্ধারের দাবি। আফ্রিকার হতদরিদ্র দেশ হাইতিতেও বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। হাইতিয়ানদের প্রতিবাদের কেন্দ্রে ছিল পেট্রোলিয়ামের দামে ভর্তুকি বাড়ানোর দাবি।

লেবাননের নাগরিকরা হোয়াটসঅ্যাপের ব্যবহারের উপর আরোপিত নতুন ট্যাক্স নিয়ে আপত্তি জানাতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এছাড়া উগান্ডায় সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্যাক্স আরোপ করায় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য দেশবাসী বিক্ষোভের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছে।

আফ্রিকার আরেক দরিদ্র দেশ সুদানেও খাদ্য ও জ্বালানীর ভর্তুকি কমানোর জন্য প্রতিবাদ জানায় দেশটির সাধারণ মানুষ। চিলিতে পাতাল রেলের ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদ হিসেবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। এই হলো বিশ্বব্যাপি প্রতিবাদের সামান্য চিত্র।

দাম বৃদ্ধির জন্য নাগরিকদের প্রতিবাদ করা অতীতে এতোটা জনপ্রিয় পায়নি। তবে  ইন্টারনেট এই ধরণের পরিবর্তনে নাগরিকর সংগঠিত করতে সহায়তা করছে।

কর্মক্ষেত্রে প্রতিবাদের জন্য শ্রমিক ইউনিয়নের মাধ্যমে প্রতিবাদ করার দীর্ঘকালীন যে ধারা চলছিল ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষ আরো বেশি সংগঠিত হচ্ছে। এখন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করছে প্রতিবাদের জন্য যা শ্রমিক ইউনিয়নগুলো আগে করতো।

যারা দাম বৃদ্ধির কুফলে ভোগেন তারা সাধারণত একে অপরকে চেনেন না বা তাদের সাধারণ সামাজিক সম্পর্কও নেই। তবে প্রত্যেকে প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষভাবে জ্বালানি ক্রয় করেন। ইন্টারনেট সাধারণ মানুষকে দামের প্রতিবাদে মানুষজনকে একত্রিত করা সম্ভব করে তোলেছে।

অন্য কথায়: শ্রমিকদের প্রতিবাদ কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে এবং গ্রাহকদের প্রতিবাদ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ফ্রান্সে “গাইলট জাউনেস” বিক্ষোভের মূল দাবিগুলোর একটি হলো ডিজনিল্যান্ড প্যারিসে বিনামূল্যে পার্কিংয়ের দাবি। কেউ যদি মনে করে এটি কিছুটা পাগলামি তবে আপনি এখনও নতুন সহস্রাব্দের প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারেননি।

আগে মূল্য বৃদ্ধির জন্য রাজনৈতিক দলের নেতারা কর্মসূচি দিয়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করতেন তবে ভবিষ্যতে চলমান পরিবর্তন অব্যাহত থাকলে রাজনৈতিকভাবে সমাধান আরও কঠিন হতে পারে। নতুন ধারাটি পরিকল্পনামাফিক নয় যা অতীতে রাজনৈতিক দলের নেতারা নির্ধারণ করতেন।

এ ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করা আরও কঠিন হবে। জীবাশ্ম-জ্বালানী ভর্তুকির বিষয়টি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। নাগরিকরা আজকাল অর্থনৈতিক ত্যাগ স্বীকার করতে অত্যধিক আগ্রহী বলে মনে হয় না।

অধিকাংশ দরিদ্র দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন বড় উদ্বেগের কোনো বিষয় নয়। কিশোরী গ্রেটা থানবার্গ দ্বারা পরিচালিত বিক্ষোভগুলো বেশিরভাগ ধনী দেশগুলিতে ছিল, তবে ভবিষ্যতে কার্বন নির্গমন উদীয়মান অর্থনীতি থেকে ক্রমবর্ধমান বিষয়ে পরিণত হবে। নেদারল্যান্ডসের কৃষকরা তাদের নাইট্রোজেন নির্গমন চালিয়ে যাওয়ার অধিকারের জন্য প্রতিবাদ করছেন।

সম্পদের পূণবন্টণকে অর্থনীতির জন্য সহজ ও সর্বাধিক কার্যকর মাধ্যম হিসাবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। অন্যদিকে দাম কম রাখার সংকটও অর্থনীতে নিম্নগামীতার দিকে নিয়ে যায় বলেও মত দেন তারা।

প্রতিবাদগুলো সমতাবাদী চাপের মতো না হওয়ায় সমস্যাগুলো খুব বেশি সমাধানের সম্ভাবনা নেই, যার ফলস্বরূপ রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে আয়োজিত গ্রাহকদের প্রতিবাদগুলোও বাম-বনাম-ডান অর্থে ঐতিহ্যগতভাবে আদর্শিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। মোটামুটি দেখার মত দৃষ্টিভঙ্গি নেই এমন ব্যক্তিরাসহ বিপুল সংখ্যাক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির লোকেরা জ্বালানি বা অন্য পণ্যের মূল্য বাড়লে অস্থির হয়ে উঠেন।

চলমান শতাব্দীতে ইন্টারনেট একটি ” সর্বনিম্ন প্রসারক সহায়ক’’ হিসেবে কাজ করে যা সম্ভাব্য বৃহত্তম প্রতিবাদে উৎসাহ দিয়ে বড় জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। মূল বক্তব্যটি হলো, যে কেউ এই বিক্ষোভের বিষয়ে তাদের পছন্দের নীতিগত পরিবর্তন আনার আশা করছেন তারা হতাশ হবেন।

বিশেষত, আমেরিকান প্রগতিশীল কাঠামোর মধ্যে অসমতার বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো প্রতিবাদকে ব্যাখ্যা করার বিরুদ্ধে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। যদিও অর্থনৈতিক বেসরকারীকরণ একটি প্রধান ধারণা। তবুও বেসরকারীকরণে তার বৈষম্যের মাত্রা অনেক কিছুই ব্যাখ্যা করবে বলে মনে হয় না।

বিশ্বের দরিদ্রতম ও সবচেয়ে অচল রাজনীতির দেশ হাইতি। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নাজুক হওয়া সত্বেও দেশটিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে আরো নাজেহাল অবস্থার মধ্যে পড়দে হচ্ছে।

এদিকে, চিলি লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে ধনী দেশ হওয়া সত্বেও দেশটিতে বৈষম্য দূর করতে না পারায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হচ্ছে। ধনী দেশ হওয়ায় বিক্ষোভগুলো প্রত্যাশার বিষয় হতে পারে।

একটি বিষয় নিশ্চিত: জনগণের বিক্ষোভের সাথে, অন্য অনেকের মতোই ইন্টারনেটও সবকিছু পরিবর্তন করছে।

লেখক: টেলর কাওয়ান, আমেরিকান অর্থনীতিবিদ ও জর্জ ম্যাশন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। লেখাটি দ্য ইন্ডেপিডেন্ট থেকে অনূদিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

7 + 11 =