Templates by BIGtheme NET
২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ইং, ১১ মাঘ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২৮ জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী

৭ মার্চের সেই ক্তৃতা দিয়ে একটা দেশ তৈরি হয়েছে

প্রকাশের সময়: নভেম্বর ২৯, ২০১৯, ৩:৫৪ অপরাহ্ণ

একাত্তরে খুব ছোট ছিলাম, ক্লাশ টু তে পড়তাম। কিন্তু স্মৃতিগুলো খুব স্পষ্ট। ৭ মার্চ বাবার সাথে রেসকোর্স গিয়েছিলাম। শুধু মনে আছে এক বিশাল জনসমুদ্রের মাঝে বাবার কাঁধে চড়ে একটা বক্তৃতা শুনেছিলাম। ছোট ছিলাম বলেই বক্তৃতা বুঝবার ক্ষমতা ছিলনা, কিন্তু এখন বুঝি, সেই বক্তৃতা দিয়ে একটা দেশ তৈরি হয়েছে।

বাবা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, ইত্তেফাক চালাতেন সেই সময়। আমার বাবাকে বলা হল, বাড়ি থেকে দূরে থাকতে, উনি কিছুদিন দূরে থাকলেন। বাসায় তখন কেবল আমি, মা আর আমার ভাই। যখন রাজাকারদের উৎপাত বেড়ে গেল, তখন সন্ধ্যা হলে এলাকার সবাই সব লাইট বন্ধ করে রাখত। প্রথম রাতে মা আমাদেরকে নিয়ে পাশের বাসায় গিয়েছিলেন, একা ভয় লাগছিল বলে। পাশের বাসায় আমার খুব ভাল বান্ধবী ছিল, ওর মাকে আমরা চাচী ডাকতাম। ব্ল্যাক আউটের রাতগুলোতে অনেকগুলো পরিবার চলে আসত ওই বাড়িতে। চাচী বলতে পারছিলেন না, শেষমেশ এক খালা বলেই ফেললেন মাকে, ‘তোমাদের এখানে না থাকাই ভাল। তোমার স্বামীকে খুঁজতে এসে তাঁকে না পেয়ে, তোমাকে এখানে পেলে, এখানে যে এতগুলো পরিবার আছে, সবাইকে মেরে ফেলবে।’ আমার মা আমাদের দু’জনকে নিয়ে অন্ধকারের মধ্যে ফিরে আসলেন আমাদের বাসায়। সেই থেকে ব্ল্যাক আউটের রাতগুলোতে মা একাই আমাদের দুই ভাই বোনকে নিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে বসে থাকতেন।

পাড়ার দু’জন সেরা ছেলে, ইউনিভারসিটিতে পড়ত তখন, হঠাৎ করে হারিয়ে গেল। বোঝা গেল মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছে। ওরা আর কখনো ফিরে আসেনি। সব বাড়িতে তখন জানালায় খবরের কাগজ লাগানো থাকত, যেন গোলাগুলি হলে জানালার কাঁচ ভেঙে কেউ আহত না হয়। বাতি জ্বালালে ব্ল্যাক আউটের সময় যেন দেখা না যায়, সেজন্যও এই ব্যবস্থা ছিল। ৩ ডিসেম্বর রাতে ঘরের মাঝখানে হারিকেন জ্বালিয়ে রেখে আমরা সবাই বসে ছিলাম। হঠাৎ বোমা পড়ল, হারিকেনটা বিকট শব্দে দূরে ছিটকে চলে গেল। গুলির শব্দ শুনলেই তখন আমি সবার আগে দৌড়ে আমার প্রিয় পুতুলটাকে আলমারির নিচে লুকিয়ে রাখতাম, পুতুলটাকে বাঁচাতে চাইতাম। আমাদের একটা রেডিও ছিল। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র শুনতে পাড়ার লোক অনেকে আসত আমাদের বাসায়। স্বাধীনতার গান হত, ‘বজ্রকন্ঠ’ শোনাত, এম আর আখতার মুকুলের ‘চরমপত্র’ শোনাত, আমারা স্বাধীনতার আশায় উদ্বেলিত হতাম।

৬ ডিসেম্বর যখন ঢাকার আকাশে যুদ্ধ শুরু হল, আমি বাবার হাত ধরে বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। পাকিস্তানী বিমানগুলো যখন উড়ে যাচ্ছে, আমি চিৎকার করে বললাম, ‘আবার এসেছে হারামজাদারা।’ জীবনে প্রথমবারের মত সেদিন গালি দিয়েছিলাম, তাও আবার বাবার সামনে। কিন্ত বাবা আমাকে কিছুই বললেন না। সবার মানসিক অবস্থা তখন এমনই ছিল যে বাবা মনে করেননি আমাকে না করার দরকার আছে।

আমাদের বাড়িতে একটা টেলিফোন ছিল। আমাদের কাছের বাড়ির একজন আর্মি অফিসারের স্ত্রী মাঝে মাঝে সেই টেলিফোনে কথা বলার জন্য আসত। তখন বাংলাদেশ থেকে যারা আর্মিতে ছিল, তাদের কেউ কেউ পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করছিল। তখন ট্রাঙ্ক কল করতে হত, সেই আর্মি অফিসারের স্ত্রী কল বুক করে বসে থাকত। যখন কল আসত, তার স্বামী বলত অমুক জায়গায় গিয়ে রেশন নিয়ে আসতে। ঘটনাটা মনে আছে কারণ তখন মানুষের খুব দুরবস্থা। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষ কখন খেতে পারবে নাকি পারবেনা এই চিন্তায় অস্থির, তার মাঝে এই আর্মি অফিসারের স্ত্রী কি নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করছিলেন।

ডিসেম্বরের ১০ তারিখ আমরা আমাদের কলাবাগানের বাসা ছেড়ে সেন্ট্রাল রোডে মামার বাসায় চলে আসলাম। ওইদিনই কলাবাগানের বাসায় রেইড হয়েছিল, খুব অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলাম আমরা। সেন্ট্রাল রোডে মামার বাসায় আমরা অনেকগুলো পরিবার একসাথে জড়ো হয়েছিলাম। তখন তুমুল যুদ্ধ চলছে। মামার একটা ট্রাঞ্জিস্টার ছিল। সেই ছোট্ট ট্রাঞ্জিস্টার ঘিরে আমরা ঘরছাড়া মানুষগুলো প্রতীক্ষার প্রহর গুনতাম, কবে দেশ স্বাধীন হবে, কবে আবার রাস্তায় নির্ভয়ে হাঁটতে পারব। মামী রান্না করত অনেক লোকের জন্য। একে তো বাজারে কিছু পাওয়া যাচ্ছিল না, তার উপর কেউ যে আনবে, তার উপায়ও নেই। একদিন কারফিউ ছাড়ল, চাদর গায় দিয়ে বাবা বের হয়ে গেলেন বাজার করতে। বাজারে কেবল কয়েক কেজি আলু পেয়েছিলেন, আর সব কিছু বিক্রি হয়ে গেছে। দামী কাশ্মীরী চাদরের মধ্যে বাবা আলু এনেছেন, সবাই তাতেই এত খুশি। মামী রান্না করলেন। কিন্তু উনি কখনো বেড়ে দিতেন না। উনি বলতেন, ‘এতগুলো বাচ্চা, ওরা চাইছে, দিতে পারছিনা, আমার অনেক খারাপ লাগে। আমি বেড়ে দেবনা।’ খালার বড় মেয়ে আমাদের বেড়ে দিতেন।

একবার ঠিক হল আমরা সবাই ঢাকার বাইরে চলে যাব। সোয়ারী ঘাট পর্যন্ত যাওয়া হল। একটা বড় নৌকা ভাড়া নেওয়া হয়েছে, আরেকটা ভাড়া নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। মা সহ কয়েকজন একটা নৌকায় উঠেও পরেছেন, এর মধ্যেই পাকিস্তানী আর্মি চলে আসল। গোলাগুলি শুরু হয়ে গেল। মাঝি বলল আমরা নৌকা ছেড়ে দেই, বাকিরা অন্য নৌকা নিয়ে আসুক। বাবা মানা করলেন, বললেন পরিবার আলাদা হয়ে যাবে। গেলে সবাই একসাথে যাবে, নয়ত কেউ যাবেনা। সোয়ারী ঘাটের কিছু লোকজন বলল, এখানে থেকে যান, রাতের বেলা আপনাদের পার করে দেব। বাবা তাতেও রাজি হলেন না, কেউ কেউ থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু বাবা সবাইকে বুঝিয়ে বাসায় ফিরে আসলেন। পরে জানতে পেরেছিলাম, ওরা দালাল ছিল, রাতে আমাদের রাজাকারদের হাতে তুলে দিত। ওইদিন সেখানে অনেক গোলাগুলিও হয়েছিল, নৌকাডুবি হয়ে অনেকে মারাও গিয়েছিল, ভাগ্যিস আমরা যাইনি।

মামার ছোট ছেলে, ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র ওয়াকার হাসান মুক্তিযুদ্ধে চলে গিয়েছিলেন। আমরা প্রায়ই শুনতে পেতাম উনি মারা গেছেন, নয়ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। মামী কিছুতেই বিশ্বাস করতেন না, বলতেন, আমার ছেলে ঠিক বেঁচে আছে। ১৬ ডিসেম্বর যখন দেশ স্বাধীন হল সেদিন সবাই আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিল মনে পরে। সেই সাথে আরেকটা ছবি চোখে ভাসে, মামী গেটে দাঁড়িয়ে আছেন। বিদ্ধস্ত কাপড়ে ক্লান্ত মুক্তিযোদ্ধারা চোখে উল্লাস নিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। আর মামী সবাইকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করছেন, “তোমরা আমার ওয়াকারকে দেখেছ? আমার ওয়াকার কোথায়?” স্বাধীন হওয়ার আনন্দের দিনে এই রকম কত মা সেদিন তাদের ছেলেদের জন্য অপেক্ষা করেছেন, যে ছেলেরা চলে গিয়েছিল বলেই দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই ছেলেদের অনেকেই আর ফিরে আসেনি।

এমনি লক্ষ মায়ের হাহাকার, ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত, লক্ষ লক্ষ মা বোনের চরম নির্যাতনের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীনতা। প্রায় এককোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে পাশের দেশে চলে গিয়েছিল। দেশের ভিতরে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ। একাত্তরের কথা ভাবতে গেলে আমি আবার সেই ছোট্ট মেয়েটি হয়ে যাই, যে ব্ল্যাক আউটের রাতের অন্ধকারে প্রচন্ড আতংক নিয়ে মায়ের সাথে গুটিসুটি বসে থাকত। এই প্রজন্মের বড় সৌভাগ্য, তাদের এই দিনগুলো দেখতে হয়নি। মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট, ত্যাগ, নির্যাতনের বিনিময়ে যে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, তা যেন ভুলে না যাই, এই স্বাধীনতার মর্যাদা যেন আমরা রক্ষা করতে পারি।

—ডা. দিপু মনি

শিক্ষামন্ত্রী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

four × three =