Templates by BIGtheme NET
২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং, ১১ ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২৭ জমাদিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

‘জান দিতে প্রস্তুত’ জনগোষ্ঠী থেকে উঠে এসেছেন শেখ সাহেব

প্রকাশের সময়: জানুয়ারি ১০, ২০২০, ১১:০২ পূর্বাহ্ণ

আফসান চৌধুরী: বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে আমরা খুব স্বল্পসময়ের পরিসরের সন্ধান করি। কিন্তু বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। এই ইতিহাস একেবারে ইংরেজ আমল থেকে সরাসরিভাবে যাত্রাপথ শুরু করেছে বাংলাদেশের দিকে। প্রথম পর্যায়টা ছিল কৃষক আন্দোলন, যা রাষ্ট্র গঠনের আগে প্রস্তুতি পর্ব ছিল। এ বিষয়টি আমাদের ইতিহাসে খুব একটা আলোচনা হয় না। আমরা যেসব সমীরকণ দিয়ে ইতিহাস আলোচনা করি, সেগুলো আমাদের কিছুটা হলেও পশ্চিমা জাতীয়তাবাদী ধারণা অথবা কলকাতাকেন্দ্রিক ধারণা থেকে নেওয়া। পশ্চিমা ইতিহাসে তো কৃষক কখনো রাষ্ট্র গঠনে বড় ভূমিকা পালন করেনি। তাই তাদের ধারণা দিয়ে আমাদের ইতিহাস বিবেচনা করা কঠিন।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি এসে কৃষক আন্দোলনের রাষ্ট্রকেন্দ্রিক রাাজনীতিকরণ হয়। সব কৃষক আন্দোলনই ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঙ্গে যৌথ আন্দোলন। সেটি ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন হোক, সেটি তিতুমীরের আন্দোলন হোক, আরও অন্য যেসব আন্দোলন হয়েছে। সব আন্দোলনে এটা লক্ষ করা যায়।

আমরা যেহেতু প্রধানত ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের কথা বলি, সেহেতু ভুলে যাই শেখ সাহেবের ইতিহাস কিন্তু ভাষাভিত্তিক আন্দোলনে শুরু হয়নি। বস্তুতপক্ষে তার আন্দোলনটা শুরু হয়েছে গোপালগঞ্জ থেকে। আমি মনে করি, সেদিক থেকে গোপালগঞ্জের গুরুত্বটা হচ্ছে, এটা একেবারে প্রান্তিক একটা অঞ্চল, এখানকার মানুষের অবস্থা খুব দুর্দশাগ্রস্ত-গরিব এবং কিছু মানুষ এখান থেকে ওপরে উঠে এসেছে, মধ্যস্বত্বভোগী অর্থনীতি থেকে, তারা স্বল্প কিছু মানুষ। তারা কিছুটা লেখাপড়া শিখে ছোট ছোট চাকরি করছে।

শেখ মুজিবুর রহমানের বাবা ছিলেন কোর্টের একজন রেকর্ডকিপার। ওই চাকরিকে এখন তো আমরা মূল্যই দেব না। কিন্তু সেই মানুষটার ঘরে জন্মাচ্ছে এমন একজন, যিনি ইতিহাসে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ১৯০৫ সালে যে বঙ্গভঙ্গ হলো, তার একটা বড় কারণ ইংরেজদের ওপর এই চাপটা ছিল কৃষকদের। কৃষক কিন্তু ইংরজেদের ভয় পাইয়ে দিয়েছে। উপনিবেশওয়ালারা শহুরে মধ্যবিত্তদের ভয় পেত না। তারা ভয় পেত কৃষকদের। কারণ এই কৃষক বিদ্রোহ করে, এই কৃষক জান দিতে প্রস্তুত।

শেখ সাহেব যে জনগোষ্ঠী থেকে এসেছেন, সেটি হচ্ছে ওই জান দেওয়া জনগোষ্ঠী। এই জান দেওয়া জনগোষ্ঠী থেকে উঠে এসে একজন মানুষ যখন রাজনীতি করেন, তিনি তো আর ‘নরম-সরম ভদ্রলোক’ হয়ে করেন না। কলকাতার যে বাবু সংস্কৃতি, সেটির অংশ তিনি নন। এই বাবুশ্রেণি বলতে বোঝায় শিক্ষিত, ব্রাহ্মসমাজীয় সংস্কৃতি। শেখ সাহেব মারদাঙ্গা একজন মানুষ। এই কথাগুলো মানুষ কেন বলে না, শেখ সাহেব প্রথম জেলে গেছেন মারপিট করে। শেখ সাহেব খুব অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘ও আমাকে লাঠি মারতে এসেছিল, আমি লাঠি ছিনিয়ে নিয়ে তার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছি।’ এই ধরনের মানুষ শেখ মুজিব।

শেখ সাহেব স্কুলে রীতিমতো মারপিট করা একটা ছেলে। তিনি দাপটের সঙ্গে চলতেন। এই যে মানুষটা, তাকে পরে ইংরেজরা ভয় করত। তাকে দেখে কলকাতার এলিট শ্রেণি ভয় করত। অতএব যেভাবে শেখ সাহেব রাজনীতি শুরু করেছেন, সেটি মারপিটের ওপর ভিত্তি করে। গোপালগঞ্জে মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টি মিটিং করতে গিয়েছিল, কংগ্রেসের লোকরা এই মিটিংয়ে বাধা দিয়েছিল। পরে শেখ সাহেব সেখানে গিয়ে তার দলবলসহ মিটিং করেছেন। অতএব তার চরিত্রটা পরিষ্কার হয়।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন, তার ধারাবাহিতায় এসে একটা পর্যায়ে এটা রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে এসে প্রবেশ করে। এই রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়াও কিন্তু প্রবেশ করেছে ১৯২০-৩০ সালের দিকে। অতএব আমাদের এই ৩০ দশকের রাজনীতিটা অনুধাবন করা দরকার। এই রাজনীতির জন্মের সূত্রটা হচ্ছে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ। ভারতীয় ও কলকাতাকেন্দ্রিক ইতিহাসবিদরা বঙ্গভঙ্গকে গালমন্দ করেন। এর অন্যতম কারণ, ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ হয়েছিল এর সূত্র ধরে। কিন্তু ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, পূর্ববাংলার মানুষ অর্থাৎ জমিদারবিরোধী জনগোষ্ঠী এটাকে স্বাগতম জানিয়েছিল।

এর বিরোধিতা সবচেয়ে বেশি এসেছিল কলকাতাকেন্দ্রিক জমিদার শ্রেণি, উকিল শ্রেণি ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির কাছ থেকে। তারাই সৃষ্টি কয়েছিল স্বদেশী আন্দোলন। কিন্তু স্বদেশী আন্দোলন ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রোধ করে দিয়েছিল। তবে যেটা তারা করতে সক্ষম হয়নি, সেটি হচ্ছে বিদ্রোহী জনগোষ্ঠীর শক্তিটাকে দমাতে। ১৯০৯ সালে যখন ভোট চলে আসে, তখন এটার মৌলিক পরিবর্তন হয়ে যায়। এতদিন পর্যন্ত কলকাতার ভদ্রশ্রেণি কলকাতাকেন্দ্রিক, এমনকি দিল্লিকেন্দ্রিক ভদ্রশ্রেণি অনেক কিছু বলতে পারত, ছড়ি ঘোরাতে পারত। কিন্তু যখন কৃষকের হাতে ভোট চলে এলো, এই অদম্য শ্রেণিটাকে রোধ করার ক্ষমতা তখন আর কারও রইল না। কারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাজনীতি করতে হলে তার ভোট দরকার। এ ভোটটা তো কৃষকের ভোট।

বাংলার বেশিরভাগ মানুষ হচ্ছে কৃষক এবং এই পূর্ববাংলার বেশিরভাগ বিশেষ জনগোষ্ঠীর মানুষ। যারা মনে করছে যে, এটাই আমার রাজনীতি। এই রাজনীতিক ধারাবাহিকতাকে অস্বীকার করে মানুষ রাজনীতিতে টিকতে পারেনি। উদাহরণস্বরূপ- ১৯৩৭ সালের নির্বাচন, যেটা অ্যাক্ট অব ১৯৩৫-এর অধীন হয়েছিল। সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন, প্রথম নির্বাচন যেহেতু, যার মাধ্যমে এই বাঙালি জাতিগোষ্ঠী বলে যদি কিছু থাকে, তার প্রতিনিধিরা এই দেশে প্রথম সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। যেমন- ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশেম এই জনগোষ্ঠীর মানুষ। মুসলিম লীগেরই তারা সদস্য ছিলেন, ফজলুল হক ছিলেন কৃষক প্রজা পার্টির। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে তারা কিন্তু এই পূর্ববঙ্গের ভোটে জিতেছিলেন। তবে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে এই ফজলুল হকের একেবারে ভরাডুবি হয়। মাত্র দুটি সিট জিতেছিলেন। এর কারণ পূর্ববঙ্গের কৃষক মনে করেছিল যে, এই লোকটা কৃষকের সঙ্গে গাদ্দারি করেছে। যেহেতু তিনি মুসলিম লীগ ছেড়ে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ কৃষকের শক্তি যে কত, সেটি চল্লিশের দশকে এসে বোঝা যায়।

শেখ সাহেব কোন সামাজিক অবস্থান থেকে এসেছিলেন, সেটি বোঝা দরকার। আমার মনে হয়, এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনাটা কম হয়। শেখ সাহেব শ্রেণিগতভাবে সাহসী। কারণ টিকতে হলে সাহসী হতে হবে। তিনি যে জনগোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন, তারাই কিন্তু আমাদের আন্দোলনগুলো করেছে। সেই শ্রেণি কৃষকদের নেতৃত্ব দিতে পারে, যে শ্রেণি কৃষকের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। এই শ্রেণি হচ্ছে শেখ সাহেবের শ্রেণি এবং এটাই তিনি করেছেন। তিনি সবচেয়ে সাহসী মানুষ হিসেবে সামনে এসেছেন।

শেখ সাহেব হোক বা মওলানা ভাসানী হোক, সাহসী ছাড়া ইংরেজ বা প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে রাজনীতি করা সম্ভব ছিল না। যেমন- ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবকে পাকিস্তানিরা যদি ভয় না পেত, তা হলে কি গণহত্যার পরিকল্পনা করত না। এটাই হচ্ছে মূল বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

five × two =