Templates by BIGtheme NET
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং, ১২ আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৯ সফর, ১৪৪২ হিজরী

কী আশ্চর্য সেই ভবিষ্যদ্বাণী!

প্রকাশের সময়: আগস্ট ৮, ২০২০, ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ

তোয়াব খান :

বঙ্গবন্ধুকে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অনেক আগে থেকেই দেখেছি। তবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ স্বাধীন বাংলা বেতারের কর্মীদের বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে। বঙ্গবন্ধু জানতে চান—কে কী করেছে। সময়টি বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর। গণভবনে, এখন যেটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। রমনা পার্কের অন্যদিকে। আমি তখন দৈনিক বাংলার সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। মুক্তিযুদ্ধ থেকে এসে দৈনিক বাংলাতেই ফিরে গেছি। আমাদের লক্ষ্যই ছিল, যে যেখানে ছিলাম, সেখানেই যাব। এই সাক্ষাৎকারের সময় বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলা বেতারের কে কোথায় আছেন, কী করছেন—এসব জানতে চান। আমি কিছু বলার আগেই বঙ্গবন্ধু বললেন, ওকে তো আমি জানি। ও তো দৈনিক বাংলায় আছে, সম্পাদক। এখান থেকেই জানা ও বোঝার পালা শুরু। বঙ্গবন্ধু বললেন, মাঝে মাঝে এসো। কথা বলব।

প্রধানমন্ত্রীর ওখানে অর্থাৎ গণভবনে আমি যোগ দিয়েছি ১৯৭৩ সালের মে মাসে। এর আগে কিছু ঘটনা আছে। ১৯৭৩ এর ১ জানুয়ারি ঢাকায় বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভটা ছিল মার্কিনবিরোধী। ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে। মার্কিন তথ্যকেন্দ্র ছিল প্রেস ক্লাবের উল্টো দিকে। ওইখানে বিক্ষোভ করে ছাত্ররা। গুলি চলে। সেখানে একজন ছাত্র মারা যায়। এটা পত্রিকায় ছাপা হয়। পরের দিন হরতাল হয়। এই নিয়ে দৈনিক বাংলা তখন একটি টেলিগ্রাম বের করে। বঙ্গবন্ধু ওই সময়ে নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত। তিনি ছিলেন ঢাকার বাইরে।

দৈনিক বাংলা থেকে আমাকে ওএসডি করা হলো। তখন তথ্যমন্ত্রী ছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘আপনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন।’ আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি আমাকে বললেন, ‘দেখো, এখন নির্বাচন প্রচারে ব্যস্ত আছি। আমি যদি নির্বাচনে বেশ ভালোভাবে জিতে আসি তাহলে আমি প্রধানমন্ত্রী থাকব। আর আমি যদি মারজিন্যাল মেজরিটি পাই তাহলে আমি জাতির পিতা হিসেবে থাকব। তখন তুমি তোমার মতো করে কাজ করো। আমি প্রধানমন্ত্রী হলে তোমাকে আমার কাছে আসতে হবে। আমার কিছু কাজ আছে সেগুলো তোমাকে করে দিতে হবে। আমি কী করব?

একদিন দুপুরে আমার মেয়েদের নিয়ে স্কুল থেকে বাসায় ফিরেছি। তখন আমার স্ত্রী বললেন গণভবন থেকে দুইবার টেলিফোন করেছিল। তোমাকে এক্ষুনি যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। আমি যোগাযোগ করলাম। আমাকে যেতে বলা হলো। তখন দুপুর ২টা কিংবা আড়াইটা বাজে। আমি গণভবনে গেলাম। দেখলাম তোফায়েল সাহেব আছেন, রাজ্জাক সাহেবও আছেন। রফিকউল্লাহ চৌধুরী তখন সচিব, তিনিও ছিলেন। তাঁরা আমাকে নিয়ে গেলেন। বঙ্গবন্ধু তখন সবেমাত্র লাঞ্চ শেষ করেছেন।

তিনি বললেন, ‘কোথায় ছিলে তুমি? ইলেকশন হয়ে গেছে। এখন তো তোমাকে যোগ দিতে হবে। আমার কাজ করতে হবে। এই কাজগুলো তোমাকে করতে হবে। কাজগুলো কী সেটা আমি পরে জেনেছি। বললেন যে এক্ষুনি রফিকউল্লাহর কাছে গিয়ে যে কাগজপত্রগুলো সাইন করা দরকার ওটা সাইন করো, তারপরে আসো। আমি কাজে যোগ দিলাম মে মাসে। তারপর আমাকে বঙ্গবন্ধু বললেন, তিনি একটি আত্মজীবনী লিখবেন। দুনিয়ার সব বড় বড় রাজনৈতিক নেতা আত্মজীবনী লেখেন ডিকটেশন দিয়ে। পরে এগুলো যথাযথভাবে এডিটিং এবং পরিচ্ছন্ন করা হয়। দুনিয়ার সর্বত্রই এই রীতি। একপর্যায়ে আমার ঘাড়ে এসে পড়ল প্রেস উইংসের কাজ।

বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কাজ করাটা যে গৌরবের, এটা উল্লেখের প্রয়োজন নেই। তবু বলতে হচ্ছে। কারণ একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে আমাকে গণভবনে যোগ দিতে হয়েছিল। এই কথাটি মনে রেখেই বলতে হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু সরকারের প্রধান কার্যনির্বাহী প্রধানমন্ত্রীই নন, জাতির জনক রাষ্ট্রের স্থপতি স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান কাণ্ডারি এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতায় পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ। ব্যক্তি শেখ মুজিবও অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই যে অবস্থা ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা থেকে আসি না কেন, সম্পর্কের নৈকট্য স্থাপনে কোনো অসুবিধার সৃষ্টি হয়নি। কর্মক্ষেত্রে প্রথম দিন থেকেই বঙ্গবন্ধুই ব্যবধানটা ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু ব্যক্তি পর্যায়ে প্রত্যেক কর্মী যারা তাঁর সঙ্গে কাজে জড়িত তাদের ব্যক্তিগত খবরাখবর নেওয়াটা ছিল তাঁর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। কোনো কারণে কাজের ক্ষেত্রে কিছুক্ষণ দেরি হয়েছে, উদ্বিগ্ন বঙ্গবন্ধু খোঁজ নিয়েছেন। জানতে চেয়েছেন, কেউ অসুস্থ কি না। চিকিৎসার জন্য ইমিডিয়েটলি ডাক্তারকে ডাকতে হবে কি না। এভাবেই ব্যক্তি পর্যায়ের খোঁজখবর নেওয়াতে কোনো ব্যতিক্রম দেখা যায়নি।

আবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যাঁরা কাজ করতেন তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ ব্যবস্থা তিনি নিতেন। গণভবন যখন শেরেবাংলানগরের নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হলো তখনকার একটি ঘটনা। নতুন গণভবনের পাশের একটি লাল বাড়ি আমার জন্য বরাদ্দ হলো। এই সময় আমি খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ায় একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাস করতাম। বরাদ্দের খবরটি শুনে বঙ্গবন্ধু বললেন, তোয়াবের জন্য একটি বাড়ি বরাদ্দ হলো। এটি ভালো খবর। কিন্তু খিলগাঁও ছেড়ে গণভবন এলাকায় চলে যাওয়াতে তোয়াবের কাছ থেকে বাইরের যে খবরগুলো পেতাম, ওটা আর পাব না।

প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা, পলিটিশিয়ানদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতাই আমার ছিল না। খুব স্বাভাবিক, আমার সংকোচ ছিল, দ্বিধা ছিল। বঙ্গবন্ধু নিজেই ডেকে এগুলো দূর করে দিয়েছিলেন। যে মুহূর্তে যেটা প্রয়োজন হবে, যে তথ্য পাওয়া যাবে তাঁকে সরাসরি বলা। কোনো দ্বিধা-সংকোচের কিছু নেই।

১৯৭৫ সালের মার্চ মাসের একটি ঘটনা। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। গণভবনের আশপাশে যাঁরা থাকেন তাঁদের সন্তানরা এসেছে গণভবনের ১৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুকে ফুল দিতে। আমি জানিও না। আমি কাজ করছি। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তোয়াবকে ডেকে নিয়ে আসো।’ আমি ছুটে গেলাম। আমাকে বললেন, “দেখো ও বলছে আমাকে চেনে। ও চিনল কী করে? বললাম, ‘তুমি কে?’ ও বলছে, ‘আপনি আমার বাবাকে চেনেন, আমাকেও চেনেন।’ আমি বললাম, কে তোমার বাবা? বলতে চায়নি। দু-তিনবার বলার পরে বলেছে।”

দেখলাম আমার ছোট মেয়ে এষা অন্যদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছে। স্লোগান দিয়েছে, বঙ্গবন্ধুর শুভ জন্মদিন, জয় হোক। এবার আমাকে বঙ্গবন্ধু বললেন, তুমি এখানে আসোনি কেন? আমি বললাম, ‘ওরা এসেছে ওদের মতো। আমি তো আমার মতো কাজ করছি। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের জন্য বঙ্গবন্ধুর স্নেহ-মমতা ছিল সবার ওপরে।

বঙ্গবন্ধুর অগ্রগামী চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হয়েছে এমন নয়। বিদেশে বিশেষ করে শীর্ষ পর্যায়ের সম্মেলন এবং আলাপ-আলোচনায় অনুপম দক্ষতা লক্ষ করা যায়।

চিলির নির্বাচিত প্রগতিশীল প্রেসিডেন্ট আলেন্দেকে হত্যার পর বঙ্গবন্ধু অবিলম্বে নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি প্রচার করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি এ কথাও বলেছিলেন, একে একে আমাদের সবাইকে এভাবেই শেষ করা হবে। এবার টার্গেট করা হবে আমাকে।

কী আশ্চর্য সেই ভবিষ্যদ্বাণী!

লেখক : উপদেষ্টা সম্পাদক, জনকণ্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

one × 3 =