Templates by BIGtheme NET
৩১ অক্টোবর, ২০২০ ইং, ১৫ কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১২ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

ধর্ষণ মামলায় দণ্ডিতদের পক্ষে বিএনপি মহাসচিবের বিবৃতি, ভিকটিমের পরিবারের উদ্বেগ

প্রকাশের সময়: অক্টোবর ৮, ২০২০, ৯:৪৮ পূর্বাহ্ণ

ফেনীর সোনাগাজীতে এক স্কুলছাত্রীকে অপহরণ ও ধর্ষণ মামলায় দণ্ডপ্রাপ্তদের পক্ষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিবৃতি দেওয়ার ঘটনায় ছাত্রীর বাবা ও মামলার বাদী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও চলছে সমালোচনার ঝড়!

মামলার বাদী সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, এটি কোনও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মামলা ছিল না। আমার মেয়েকে অপহরণের পর পাশবিক নির্যাতনের মামলা ছিল। একজন অপরাধীর দলীয় পরিচয় বড় হতে পারে না। একজন অপরাধী আইনের চোখে দোষী প্রমাণিত হওয়ার পরও দলীয় স্বীকৃতি দিয়ে তার পক্ষে বিবৃতি দেওয়া অন্যায়কে উৎসাহী করার শামিল।

নেতাদের উস্কানিতে দণ্ডিতদের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বাদীর পরিবারকে হেয় করে স্ট্যাটাস দিচ্ছে বলেও জানান তিনি। এতে তিনি চরম হতাশা প্রকাশ করেন।

ছাত্রীর বাবা বলেন, যেখানে বিএনপি নেতাদের ভিকটিম ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কথা ছিল, সেখানে তারা দণ্ডপ্রাপ্তদের পক্ষে দাঁড়িয়ে একটি পাশবিক নির্যাতনের মামলাকে রাজনৈতিক মামলা হিসেবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সেদিন কোথায় ছিল তাদের আবেগ?

সূত্র জানায়, সোনাগাজীর এক স্কুলছাত্রীকে অপহরণ ও ধর্ষণ মামলায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ ২৫ জুন মঙ্গলবার দুপুরে রায় ঘোষণা করেন। রায়ে পৌর ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক আবু বক্কর ছিদ্দিক সাগরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা, উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক মেজবাহ উদ্দিন পিয়াস, সোনাগাজী সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক বায়েজিদ ফয়সাল, সোনাগাজী পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি রিয়াদ হোসেন ও গাড়িচালক যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলমসহ চার জনের ১৪ বছর করে কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে জরিমানা করেন।

রায়ে চার্জশিটভুক্ত আরও পাঁচ আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। তারা হলেন, প্রধান আসামির মা বিবি কাউছার, তার ভাই মো. সুমন, অপর ভাই আবু নাছের সোহাগ, যুবলীগ নেতা আলাউদ্দিন আলো ও মো. মাসুদ।

রায়ের পর দিন (২৬ জুন) বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উদ্ধৃতি দিয়ে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক বেলাল উদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই রায়কে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রায় আখ্যা দিয়ে ছাত্রদল নেতা মেজবাহ উদ্দিন পিয়াস ও রিয়াদ হোসেনের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করা হয়।

বিবৃতিতে তাদের নির্দোষ আখ্যা দিয়ে রায়ের বিরুদ্ধেও নিন্দা জানানো হয়। পরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুই ছাত্রদল নেতার পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্তদের অনুসারীরা পোস্ট দিতে থাকেন।

অভিযোগ রয়েছে, দণ্ডপ্রাপ্তদের দায়িত্ব তারেক রহমান নিয়েছেন এই বার্তা নিয়ে একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা ওই দুই ছাত্রদল নেতার বাড়িতে এসে তাদের পরিবারকে সমবেদনাও জানিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার (৪ জুলাই) বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল লতিফ জনিও দুই নেতার বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানান।

মামলার বাদী ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, সোনাগাজী উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের চরলামছি গ্রামের আবু তাহেরের ছেলে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবু বক্কর ছিদ্দিক সাগর সোনাগাজীর মোহাম্মদ ছাবের পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির এক ছাত্রীকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে উত্ত্যক্ত করতো।

প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ২০১৩ সালের ২৫ মে সকাল ৬টায় প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথে ওয়াপদা কলোনি সংলগ্ন চৌধুরী লেনের সামনে থেকে তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করা হয়। পরে ওই ছাত্রীকে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে ছাত্রদল নেতা মেজবাহ উদ্দিনের খালার বাড়িতে রেখে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় ছাত্রীর বাবা বেলায়েত হোসেন বাদী হয়ে ছয় জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ৩/৪ জনকে আসামি করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ছাত্রদল নেতা মেজবাহ উদ্দিনের মামা বিএনপি নেতা আবদুল মতিনকে আটক করে পুলিশ। তার মোবাইল ফোনের কললিস্টের সূত্র ধরে মেজবাহকে গ্রেফতারে তৎপর হয়ে ওঠে পুলিশ। পরে মেজবাহর দেওয়া তথ্যমতে সোনাগাজী থানার পুলিশ দুর্গম পাহাড়ে তার খালার বাড়ি থেকে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে। পরে ফেনী সদর হাসপাতালে শারীরিক পরীক্ষার পর ওই ছাত্রী আদালতে ২২ ধারায় জবানবন্দি দেয়।

সোনাগাজী মডেল থানার তৎকালীন এস আই স্বপন কুমার বডুয়া মামলাটির দীর্ঘ তদন্ত শেষে ১০ জনকে অভিযুক্ত করে ২০১৩ সালের ২৫ জুলাই আদালতে চার্জশিট দেন।

এদিকে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামি আবু বক্কর ছিদ্দিক সাগর ২০১৮ সালে জামিনে মুক্তি পেয়ে পলাতক রয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত অপর চার আসামি কারাগারে আছে।

তবে ওই ছাত্রীর বাবা জানান, ছাত্রদল নেতা মেজবাহ উদ্দিন ও রিয়াদ হোসেনের নাম তিনি এজাহারে দেননি। তবে পুলিশের তদন্তে তা উঠে আসে। অথচ প্রমাণিত একটি জঘন্য অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্তদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা।

জেলা বিএনপির সাধার সম্পাদক জিয়া উদ্দিন মিস্টার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সোনাগাজী উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক মেজবাহ উদ্দিন পিয়াস ও সোনাগাজী পৌর ৪ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি রিয়াদ হোসেনের নাম এজাহারে ছিল না। পরে বাদীর কোনও জবানবন্দিতেও তাদের নাম আসেনি। এর পরেও তাদের সাজা দেওয়ায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবৃতি দিয়েছেন। আমরা এ বিবৃতি সমর্থন করি।

তবে সোনাগাজী সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফয়সল অভিযোগ করেন, উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক মেজবাহ উদ্দিন পিয়াস তার বোনকে অপহরণ করেছে। এ বিষয়ে আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা বিচারধীন রয়েছে। সে ২০১০ সালে ছাত্রলীগ থেকে ছাত্রদলে অনুপ্রবেশ করে। কিন্তু সে ছাত্রলীগের পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে অপরাধ করছে।

তিনি দাবি করেন, মেজবাহ উদ্দিন পিয়াসের অপকর্ম আড়াল করে একটি মহল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামকে দিয়ে বিবৃতি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। তার দাবি, মহাসচিব প্রকৃত বিষয় জানলে এ ধরনের বিবৃতি দিতেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

two × one =