Templates by BIGtheme NET
১৬ জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২ মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ২ জমাদিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ওয়েবিনার
রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল গঠনে দরকার বৈশ্বিক প্রচেষ্টা

প্রকাশের সময়: নভেম্বর ৪, ২০২০, ১২:৪০ অপরাহ্ণ

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গাদের জন্য ‘নিরাপদ অঞ্চল’ গড়ে তোলা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। একই সঙ্গে আসিয়ান দেশ চীন, ভারত ও জাপান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায় ও বাংলাদেশের জনগণকে সংবেদনশীল করা, এ সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ ও রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধান অনুসন্ধানে বিস্তৃত আলোচনার জন্য ‘রোহিঙ্গা সংকট :একটি টেকসই সমাধানের সন্ধানে’ শিরোনামে ওয়েবিনার সিরিজের আয়োজন করা হয়েছে। ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা :বাংলাদেশ ও বিশ্বের প্রতিক্রিয়া’ শিরোনামে রোববার এ ওয়েবিনারের প্রথম সেশনে এ পরামর্শ দেন ড. ইমতিয়াজ।

সেন্ট্রাল ফাউন্ডেশন ফর ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (সিএফআইএসএস) চেয়ারম্যান কমডোর (অব.) নুরুল আবসার অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এবং স্বাগত বক্তব্য দেন। বিশ্বের অন্যতম নিপীড়িত সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের শান্তি ও আশার আলোর জন্য একটি রোডম্যাপ সন্ধানের ওপরেও জোর দেন তিনি।

নুরুল আবছার শুরুতেই বলেন, ‘এই মানবিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে একা করে দেওয়া উচিত নয় বিশ্বেচর।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানবিকতা বিবেচনায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগের প্রতি উদাসীন না হওয়া এবং বাংলাদেশের কেবল ত্রাণসেবা সরবরাহ না করে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আরও বেশি প্রচেষ্টা চালানো।’

এতে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। প্রথমে গণহত্যা কী এবং গণহত্যার ইতিহাস ব্যাখ্যা করেন তিনি। এর পর তিনি মিয়ানমারে ‘স্লো জেনোসাইড’ বা ‘হিডেন জেনোসাইড’-এর ইতিহাস ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, মিয়ানমারে ১৯৬২ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে অত্যাচার শুরু করে। ১৯৯০ সাল থেকে দেশটিতে সন্ন্যাসী, মঠ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক বার্মিজের জীবনে ক্রমবর্ধমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া ১৯৮৮ ও ২০০৭ সালে বিদ্রোহে সন্ন্যাসীদের ভূমিকা তাদের একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নৈতিক কর্তৃত্বের অবস্থায় নিয়ে যায়।

২০১৩ সালের শেষদিকে দ্য ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) তথাকথিত ‘হোয়াইট কার্ড’ধারীদের (রোহিঙ্গা, যাদের সাধারণ নাগরিকত্ব নেই) ভোট প্রদানের ক্ষমতা দেওয়ার জন্য সাংবিধানিক সংস্কারকে সমর্থন করে। কিন্তু বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা তাৎক্ষণিক এর প্রতিবাদ করলে ইউএসডিপি পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

২০১৪ সালের আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়। সে সময় তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে নিবন্ধন করতে বাধ্য করা হয়েছিল। ২০১৫ সালপরবর্তী নির্বাচনে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের সংসদে নৃগোষ্ঠীর কোনো মুসলিম সদস্য নেই।

২০১৮ সালের আগস্টে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের অনুসন্ধানে উঠে আসে, ২০১১ সাল থেকে কাচিন, রাখাইন ও শান রাজ্যে যে সামরিক নির্যাতন করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মারাত্মক অপরাধ। ওই সময়ে সংঘটিত গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের জন্য জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের (যার মধ্যে কমান্ডার-ইন-চিফ সিনিয়র জেনারেল মিন অং হেদ্মইং রয়েছেন) তদন্ত ও মামলা মোকাবিলা করতে হবে (হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-২০১৯)।

পরে অতিথি বক্তা ড. ইমতিয়াজ মিয়ানমারের একটি মানচিত্র দেখান, যাতে ২০১৪ ও ২০১৬ সালে সংঘাত ও আন্ত-সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি শনাক্ত করা হয়, যা সংঘাতের সঙ্গে জড়িত জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনের উপস্থিতিকেও চিত্রিত করে। ২০১৭ সালে গণহত্যা ও সহিংস সেনা অভিযানের কারণে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতি সম্পর্কেও বিস্তারিত দেখিয়েছেন অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ।

মেডিকেল চ্যারিটি ও মেডিসিনস

সানস ফ্রন্টিয়ার্সের (এমএসএফ) তথ্যানুসারে, ওই সময় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার মাসে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৭৩০ শিশুসহ অন্তত ৬৭০০ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছিল।

অধ্যাপক ইমতিয়াজ বাংলাদেশের মানচিত্রে রোহিঙ্গা শরণার্থীর অবস্থান শনাক্ত করে দেখান। তিনি বলেন, মাত্র তিন মাসের কম সময়ে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে পালিয়ে এসে বসতি স্থাপন করে, যা ভুটানের মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের মানবিক উদ্যোগ সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্নেষণও দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এ সংক্রান্ত পাঁচ দফা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। ড. ইমতিয়াজ উল্লেখ করেন, ১১-১৩ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শিশুদের স্কুলে পড়াশোনার অনুমতি দেওয়ার সরকারি পদক্ষেপকে অ্যাক্টিভিস্ট ও শিক্ষকরা ব্যাপকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে দাতা সংস্থাগুলোও কাজ করছে।

তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক আর্থিক সহায়তার বিষয়ও উল্লেখ করেন। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্যানুযায়ী, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য প্রয়োজনের মাত্র ৬৯ শতাংশ বিদেশি বরাদ্দ রয়েছে, যা ৬৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর প্রয়োজন ৯২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য তহবিলের প্রয়োজনীয়তা ও বিভিন্ন সেক্টর চিহ্নিত করে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর সুরক্ষা ও সহিংসতার স্তরের ওপর গ্রাফ দেখান তিনি। পরে অধ্যাপক ইমতিয়াজ এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) তদন্ত বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। একই সঙ্গে তিনি মিয়ানমারে বিদেশি বিনিয়োগ এবং মিয়ানমার সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা কীভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের তুষ্টির নীতি দ্বারা পরিচালিত হয়, তার পরিসংখ্যানগত গ্রাফ দেখান। সবশেষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গাদের জন্য ‘নিরাপদ অঞ্চল’ গড়ে তোলার পরামর্শ দেন ড. ইমতিয়াজ।

এ বিষয়ে দর্শকদের যুক্তি উপস্থাপন ও আলোচনার জন্য একটি প্রশ্নোত্তর পর্বও অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এএসএম আলী আশরাফ, অ্যাডমিরাল আউয়াল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দীন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিন রিসার্চ ডেভেলপমেন্টের ডিজি কমডোর এমদাদ অন্যদের মধ্যে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন। অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কয়েকটি প্রশ্নের ব্যাখ্যাসহ উত্তর দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

6 − two =