Templates by BIGtheme NET
৩ মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৮ রজব, ১৪৪২ হিজরি

স্মৃতির পাতায় ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১

প্রকাশের সময়: ডিসেম্বর ১৬, ২০২০, ৪:২১ অপরাহ্ণ

স্মৃতির পাতায় বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের অনেক ছবি ভেসে ওঠে। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদারমুক্ত করে ত্রিশ লক্ষাধিক প্রাণ আর দুই লক্ষাধিক মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে মহত্তর বিজয় আমরা অর্জন করি। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন সামনে নিয়ে দীর্ঘ চব্বিশটি বছর সংগ্রাম পরিচালনা করে, নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে ধাপে ধাপে অগ্রসর হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন মানুষের হৃদয়ে মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী গৌরবগাথা অম্লান থাকবে। তিনি এমন একজন মহামানব, যাঁর হৃদয় ছিল মানুষের প্রতি ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। বাংলার মানুষকে তিনি গভীরভাবে ভালোবাসতেন। বঙ্গবন্ধুর কাছে থেকে আমি তা দেখেছি। বাংলাদেশের এমন কোনো স্থান নেই, যেখানে আমি বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হয়ে যাইনি। হৃদয়ের গভীরতা থেকে ‘ভাইয়েরা আমার’ বলে যখন ডাক দিতেন, মানুষের হৃদয় প্রবলভাবে আলোড়িত হতো। রাস্তার পাশে গভীর রাতে আধো-অন্ধকারে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকত তাঁকে একনজর দেখার জন্য। তিনি গাড়ি থামাতেন। মানুষটিকে বুকে টেনে নিতেন। তাঁর সঙ্গে কুশলবিনিময় করতেন, তাকে মনে রাখতেন। সেই মানুষটিও বঙ্গবন্ধুর স্পর্শ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করত। তিনি ছিলেন এমন নেতা, যিনি কখনো কাউকে ছোট মনে করতেন না। কাউকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, হেয়প্রতিপন্ন করতেন না। পরকে আপন করতেন। যে তাঁর নীতি-আদর্শে বিশ্বাসী না সে-ও তাঁর সান্নিধ্যে আপন হয়ে উঠত। ব্যক্তিত্বের অমোঘ এক মানবিক আকর্ষণ ছিল বঙ্গবন্ধুর। সাগর-মহাসাগরের গভীরতা মাপা যাবে, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর যে অকৃত্রিম ভালোবাসা এটি কোনো দিনই পরিমাপ করা যাবে না। তিনি ছোটকে বড় করতেন, বড়কে করতেন আরো বড়। আওয়ামী লীগের প্রত্যেক কর্মীকে তিনি বড় করে তুলতে চাইতেন। কোনো নেতাকর্মীর নির্বাচনী এলাকায় গেলে তাঁর নাম ধরে সম্বোধন করে মানুষের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতেন। মনে পড়ে ’৭০-এর ২৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর ভোলা সফরের স্মৃতি।

বরিশাল-পটুয়াখালী-ভোলা একসঙ্গে সফরের কর্মসূচি নির্ধারণ করে একুশে ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করে প্রথমে ২২ তারিখ বরিশাল, ২৩ তারিখ পটুয়াখালী এবং ২৪ তারিখ ভোলার জনসভায় বক্তৃতা করেন। স্নেহমাখা ভাষায় বক্তৃতা দিয়ে আমাকে ভোলার মানুষের কাছে তুলে ধরেছিলেন। সেই বক্তৃতার কথা বলতে আজ আমার হৃদয় ভাবাবেগে আপ্লুত হয়। আমি যা না তার থেকেও বেশি ঊর্ধ্বে তুলে ধরে-’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের কথা, কী করে কারাগার থেকে আমরা তাঁকে মুক্ত করেছি, ভোলার মানুষের কাছে তা বলে-আমাকে বড় করার চেষ্টা করেছেন। এমন একজন মহান নেতার নেতৃত্বেই ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর দেশকে আমরা হানাদারমুক্ত করেছি।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই উপলব্ধি করেছিলেন, এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি। একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে। সেই লক্ষ্য সামনে নিয়েই প্রথমে নিজকে, পরে দলকে এবং বাংলার মানুষকে প্রস্তুত করে তাঁর স্বপ্ন পূরণ করেছেন। তিনি লক্ষ্য নির্ধারণ করে রাজনীতি করতেন। সেই লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য জেল-জুলুম-হুলিয়া-অত্যাচার-নির্যাতন, এমনকি ফাঁসির মঞ্চকেও তুচ্ছজ্ঞান করেছেন। কোনো দিন লক্ষ্যচ্যুত হননি। দলীয় প্রয়োজনে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন, আবার জাতীয় প্রয়োজনে দলের শীর্ষ পদ ছেড়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। পৃথিবীতে অনেক নেতা এসেছেন, আসবেন; কিন্তু মানবদরদী এমন নেতা অতুলনীয়। আজ বিজয়ের এই দিনে হৃদয়ের সবটুকু অর্ঘ্য ঢেলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে-যাঁর স্নেহে আমার জীবন ধন্য; যাঁর আদরে আমি বড় হয়েছি; যাঁর সঙ্গে বিদেশ সফরে গিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রনায়কদের তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা-ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ হয়েছি-বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।

১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ আর আমাদের মহান বিজয় সূচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি ছুটে গিয়েছিলাম কলকাতার থিয়েটার রোডে অবস্থিত প্রথম বাংলাদেশ সরকারের সদর দপ্তরে। সেখানে অবস্থান করছিলেন শ্রদ্ধেয় নেতৃবৃন্দ-গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য সর্বজনাব ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এ এইচ এম কামারুজ্জামানসহ অন্য নেতৃবৃন্দ। সবাই আনন্দে আত্মহারা! প্রিয় মাতৃভূমিকে আমরা হানাদারমুক্ত করেছি। মনের গভীরে উচ্ছ্বাস আর আনন্দ; সে আনন্দ-অনুভূতি অনির্বচনীয়! স্বাধীন বাংলার যে ছবি জাতির পিতা হৃদয় দিয়ে অঙ্কন করে নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র করে বজ্রকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘কেউ আমাদের দমাতে পারবে না।’ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অদম্য বাঙালি জাতি নেতার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে সমগ্র বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছে, জাতীয় মুক্তির ন্যায্য দাবির প্রশ্নে কেউ আমাদের ‘দমাতে’ পারে না।

’৭১-এর ডিসেম্বরের ৩ তারিখ থেকে সার্বিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ চূড়ান্তরূপ অর্জন করে। আমরা তখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে। মুক্তিবাহিনীর চতুর্মুখী গেরিলা আক্রমণে বিধ্বসত্ম পাকিসত্মান সেনাবাহিনী এদিন উপায়ান্তর না দেখে একতরফাভাবে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। পাকিস্তান বিমানবাহিনী পশ্চিম ভারতের বিমান ঘাঁটিগুলো, এমনকি দিল্লির কাছে আগ্রার বিমানক্ষেত্র এবং পূর্ব ফ্রন্টের আগরতলা বিমান ঘাঁটিতে অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেড়্গিতে রাষ্ট্রপতি শ্রী ভি ভি গিরি ও ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দের সঙ্গে জরুরি বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী রাত ১০টা ৩০ মিনিটে সারা ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করেন। রাত ১২টা ২০ মিনিটে ইন্দিরা গান্ধী বেতার ভাষণে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে সাফ জানিয়ে দেন, ‘আজ এই যুদ্ধ ভারতের যুদ্ধ হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করলো।’ পরদিন ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরম্নল ইসলাম এবং সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যৌথভাবে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি অর্জনে চিঠি লেখেন। চিঠির মূল বক্তব্য ছিল, ‘যদি আমরা পরস্পর আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রবেশ করি, তবে পাকিসত্মান সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে আমাদের যৌথ অবস্থান অধিকতর সহজতর হয়। অবিলম্বে ভারত সরকার আমাদের দেশ এবং আমাদের সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করম্নক।’ এর পরপরই ভারত পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং ৬ ডিসেম্বর, সোমবার, ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় ভারত সরকার স্বাধীন ও সার্বভৌম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’কে স্বীকৃতি প্রদান করে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ’৭১-এর ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে গৃহীত রাষ্ট্রের নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ উদ্ধৃত করে লোকসভার অধিবেশনে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, “বাংলাদেশ ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নামে অভিহিত হবে।” ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তৃতার পর লোকসভার সব সদস্য দাঁড়িয়ে তুমুল হর্ষধ্বনির মাধ্যমে এই ঘোষণাকে অভিনন্দন জানান। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভারত সরকার ও জনসাধারণের ভূমিকা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি।

স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ও মুজিববাহিনীর জন্য ৭ ডিসেম্বর ছিল এক বিশেষ দিন। এদিন মুজিববাহিনীর অন্যতম প্রধান হিসেবে আমার দায়িত্বপ্রাপ্ত অঞ্চল যশোর হানাদারমুক্ত হয়। যশোরের সর্বত্র উত্তোলিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। সেদিন সরকারের নেতৃবৃন্দ ও মুজিববাহিনীর কমান্ডারগণসহ আমরা বিজয়ীর বেশে স্বাধীন বাংলাদেশের শত্রুমুক্ত প্রথম মুক্তাঞ্চল যশোরে প্রবেশ করি। জনসাধারণ আমাদের বিজয়মাল্যে ভূষিত করে। সে আনন্দ অনুভূতির কথা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মনে পড়ে, মেজর জেনারেল ওবানের কথা। তিনি দেরাদুনে আমাদের ট্রেনিং দিতেন। আরো মনে পড়ে, মেজর জেনারেল সরকার ও ডি পি ধরের (শ্রীদুর্গাপ্রসাদ ধর, শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর উপদেষ্টা) কথা। যাঁরা প্রতি মাসেই কলকাতার হিন্দুস্তান ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে মুজিববাহিনীর চার প্রধানের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে ভারত সরকারের সঙ্গে আমাদের কাজের সার্বিক সমন্বয় করতেন। মুজিববাহিনীর হেডকোয়ার্টার ছিল কলকাতা। দেরাদুনের ট্রেনিং ক্যাম্পে আমরা বক্তৃতা করতাম। ট্রেনিং শেষে মুজিববাহিনীর সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের দেশের অভ্যন্তরভাগে প্রবেশে সহায়তা করতেন মেজর জেনারেল সরকার। ভারত সরকার প্রদত্ত অস্ত্র, অর্থ সহায়তায় সমন্বয় করতেন শ্রীফণীন্দ্র নাথ ব্যানার্জী তথা পিএন ব্যানার্জী। তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। তিনি ভারতের পূর্বাঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। যিনি মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই অর্থাৎ ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর অক্টোবর মাসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে লন্ডনে দেখা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারত সরকারের ভূমিকা কী হবে তা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আমরা তাঁকে ‘মিস্টার নাথ’ বলে সম্বোধন করতাম। আমাদেরও ভিন্ন নাম ছিল। মণি ভাইয়ের নাম ‘মণি দে’, সিরাজ ভাইয়ের নাম ‘সরোজ বাবু’, রাজ্জাক ভাইয়ের নাম ‘রাজেন দে’ এবং আমার নাম ‘তপন’। অনেকে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে মুজিববাহিনীর ভুল বোঝাবুঝির কথা বলেন। এটা সঠিক নয়। এখানে কারো ব্যক্তিগত খামখেয়ালির অবকাশ ছিল না। সবাই সুসংগঠিত-সুশৃঙ্খল। বাংলাদেশকে চারটি বৃহৎ অঞ্চলে বিভক্ত করে রাজনৈতিকভাবে অগ্রসর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সংগঠিত ছিল মুজিববাহিনী। প্রধান সেনাপতি আতাউল গনি ওসমানীর নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর (এফএফ) সঙ্গে একত্রে যুদ্ধ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে মোকাবেলা করাই ছিল মূলত মুজিববাহিনীর কাজ। মুজিববাহিনীর অন্যতম প্রধান হিসেবে শ্রদ্ধেয় নেতা শেখ ফজলুল হক মণি ভাইয়ের দায়িত্বে ছিল তত্কালীন চট্টগ্রামের নোয়াখালী, কুমিল্লা, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ঢাকা ডিভিশন (ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর বাদে); রাজশাহী বিভাগ (পাবনা ও সিরাজগঞ্জ বাদে) এবং উত্তরাঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন সিরাজ ভাই; রাজ্জাক ভাইয়ের দায়িত্বে ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল এবং সিরাজগঞ্জসহ এক বিরাট অঞ্চল আর আমার দায়িত্বে ছিল পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল এবং পটুয়াখালী জেলা। মুজিববাহিনীর ট্রেনিং হতো দেরাদুনে। দেরাদুনে ট্রেনিং শেষে আমার সেক্টরের যারা তাদের পেস্ননে করে ব্যারাকপুর ক্যাম্পে নিয়ে আসতাম। মুজিববাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের প্রাক্কালে বুকে টেনে, কপাল চুমু দিয়ে বিদায় জানাতাম।

মুজিববাহিনীর ট্রেনিং ক্যাম্পে বক্তৃতায় আমরা বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে বলতাম, ‘প্রিয় নেতা, তুমি কোথায় আছো, কেমন আছো জানি না! যত দিন আমরা প্রিয় মাতৃভূমি তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশকে হানাদারমুক্ত করতে না পারবো, তত দিন মায়ের কোলে ফিরে যাবো না।’ ১৬ ডিসেম্বর যেদিন দেশ শত্রম্নমুক্ত হয়, সেদিন আমরা বিজয়ীর বেশে মায়ের কোলে ফিরে এলাম। ১৮ ডিসেম্বর আমি ও রাজ্জাক ভাই হেলিকপ্টারে ঢাকায় আসি। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পদার্পণ করি। চারদিকে সে কী আনন্দ, ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না! প্রথমেই ছুটে গিয়েছিলাম-বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী পরম শ্রদ্ধেয়া বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল-বঙ্গবন্ধু পরিবারকে যেখানে বন্দি করে রাখা হয়েছিল সেখানে। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীর এডিসি ছিলেন এবং শেখ জামাল দেরাদুনে আমার সঙ্গেই ছিল।

কিন্তু বিজয়ের আনন্দ ছাপিয়ে কেবলই মনে পড়ছিল প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর কথা। যে স্বাধীন বাংলার সেস্নাগান তুলেছিলাম রাজপথে; যে বাংলার জন্য বঙ্গবন্ধুর গতিশীল নেতৃত্বে কাজ করেছি; পরমাকাঙ্ক্ষিত সেই বাংলাদেশ আজ হানাদারমুক্ত, স্বাধীন। বাংলাদেশ সরকারের নেতৃবৃন্দ অপূর্ব দক্ষতায় দল-মত-শ্রেণি-নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে আস্থা ও বিশ্বাসে নিয়ে সফলভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন ২২ ডিসেম্বর। বিমানবন্দরে নেতৃবৃন্দকে বিজয়মালা দিয়ে অভ্যর্থনা জানাই। রাজপথে লক্ষ লক্ষ মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে সর্বত্র মুখরিত। দিকে দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশ, আনন্দমিছিল আর চারদিক থেকে মানুষ ছুটে আসছে আমাদের দেখতে। বিজয়ের সেই সুমহান দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে গৌরবের যে দীপ্তি আমি দেখেছি, সেই রূপ বিজয়ের গৌরবমণ্ডিত আলোকে উদ্ভাসিত। স্বজন হারানোর বেদনা সত্ত্বেও প্রত্যেক বাঙালির মুখে ছিল পরম পরিতৃপ্তির হাসি; যা আজও আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু বিজয়ের আনন্দ ছাপিয়ে কেবলই মনে পড়ছিল প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর কথা। যার সঙ্গেই দেখা হয়, সবার একই প্রশ্ন, ‘বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন, কেমন আছেন, কবে ফিরবেন?’ বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য সর্বসত্মরের মুক্তিকামী বাঙালির ঘরে ঘরে রোজা, উপবাস এবং বিশেষ দোয়ার আয়োজন চলছিল। বঙ্গবন্ধুবিহীন বিজয় অপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অক্টোবরে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির আদেশ হয়েছিল। ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে শাস্তি পেতে হবে।’ জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের প্রতিনিধি আগা শাহী বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবের বিচার শুরু হয়েছে ১১ আগস্ট এবং দুই সপ্তাহের মধ্যে বিচার সমাপ্ত হবে।’ দেশ স্বাধীন না হলে ডিসেম্বরেই বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হতো। কিন্তু আমরা জানতাম বীর বাঙালির ওপর নেতার আস্থার কথা। তিনি গর্ব করে বলতেন, ‘ওরা আমাকে হত্যা করতে পারে। কিন্তু বাংলার মানুষকে তারা দাবিয়ে রাখতে পারবে না। ওরা আমাকে হত্যা করলে লড়্গ মুজিবের জন্ম হবে।’ ১৬ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হয়ে বিজয় অর্জন করার পরও আমরা নিজেদেরকে স্বাধীন ভাবতে পারিনি। কারণ, বঙ্গবন্ধু তখনো পাকিসত্মানের কারাগারে বন্দি। আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি ভারতের মহীয়সী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর কথা, যিনি নিরলসভাবে বিশ্বনেতৃবৃন্দ ও জনমতের কাছে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য আবেদন করেছেন। আমরা পরিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করেছি সেদিন, যেদিন ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি বুকভরা আনন্দ আর স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে জাতির পিতা তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন।

ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের পূর্বপরিকল্পিত নীলনকশা অনুযায়ী নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে পাকিস্তানিদের দোসর এদেশীয় রাজাকার-আলবদর বাহিনীর ঘাতকরা। ডিসেম্বর মহান বিজয়ের গৌরবমণ্ডিত মাস হলেও ১৪ ডিসেম্বর বেদনার দিন। জাতির মেধাবী সন্তানদের হত্যা করার মধ্য দিয়ে ঘাতকরা আমাদের মেধাহীন জাতিতে পরিণত করতে চেয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তঝরা দিনগুলোতে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল দেশমাতৃকার স্বাধীনতার সূত্রে। জাতীয় ঐক্যের অভূতপূর্ব নিদর্শন ছিল সেই দিনগুলো। ছাত্র-শিড়্গক-বুদ্ধিজীবী-কৃষক-শ্রমিক-যুবক সবাই আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রত্যড়্গ-পরোড়্গ অংশগ্রহণে সফল জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জন করেছি সুমহান বিজয়। আর এখানেই নিহিত আছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবের ঐতিহাসিক সাফল্য। স্বাধীনতার ডাক দিয়ে একটি নিরস্ত্র জাতিকে তিনি সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করে স্বাধীনতার এক মোহনায় দাঁড় করিয়েছেন। অথচ ভাবতে অবাক লাগে, যে পাকিস্তানের কারাগার বঙ্গবন্ধুকে আটকে রাখতে পারেনি; মৃত্যুদণ্ড দিয়েও কার্যকর করতে পারেনি-প্রধানমন্ত্রী হয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটাকে যখন তিনি স্বাভাবিক করলেন, যখন অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিলেন, ঠিক তখনই ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পরাজিত শক্তির দোসর দেশি-বিদেশি ষড়যন্¿কারী খুনিচক্র বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করল! যে স্বাধীনতাবিরোধীরা মাকে ছেলেহারা, পিতাকে পুত্রহারা, বোনকে স্বামীহারা করেছিল; জেনারেল জিয়া তাদেরকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করে মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে সংবিধান থেকে উত্পাটিত করেছিল। পরাজিত শক্তির পুনরুত্থান ও দীর্ঘকাল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালে প্রতি মুহূর্তে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি-তাতে কেবলি মনে হয়েছে, বিজয়ের আনন্দ ক্ষণস্থায়ী, আর পরাজয়ের গস্নানি দীর্ঘস্থায়ী! মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি পরাজয়ের গ্লানি ভোলেনি। স্বাধীন বাংলাদেশে তারা এখনো বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার দুঃসাহস দেখায়!

দুটি লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছেন। একটি, স্বাধীনতা-যেই স্বাধীনতার ডাক তিনি দিয়েছিলেন ’৭১-এর ছাব্বিশে মার্চ, যা পূর্ণতা লাভ করেছে ১৬ ডিসেম্বর। আরেকটি, বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। সেই লক্ষ্যেই তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। আজকে যদি দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বঙ্গবন্ধু বাস্তবায়ন করতে পারতেন, তবে বহু আগেই বাংলাদেশ মালয়েশিয়াকে ছাড়িয়ে যেত। আজ বঙ্গবন্ধু নেই, টুঙ্গীপাড়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। আর কোনো দিন আসবেন না। কিন্তু তাঁর রক্তের ও চেতনার উত্তরসূরি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা-বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পতাকা যাঁর হাতে ’৮১ সালে আমরা তুলে দিয়েছিলাম-সেই পতাকা হাতে নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে, সততার সঙ্গে দল পরিচালনা করে চারবার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছেন; তাঁরই সুযোগ্য নেতৃত্বে সব ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল চ্ছিন্ন করে প্রমত্তা পদ্মার বুকে স্বপ্নের সেতু আজ দৃশ্যমান। বাংলাদেশ এখন আন্ত্মর্জাতিক বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। সুতরাং সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সেই দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি-শোষণমুক্ত, ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় সংসদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

eighteen − 7 =