Templates by BIGtheme NET
১৩ মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০ বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৩০ রমজান, ১৪৪২ হিজরি

কমান্ডার সেজে প্রকাশ্যে খতম করার উস্কানি

প্রকাশের সময়: এপ্রিল ২০, ২০২১, ৯:৩৮ পূর্বাহ্ণ

নিজেকে মাওলানা নয় বরং ‘সেনাপ্রধান’ বা ‘কমান্ডার’ ভাবতেই বেশি পছন্দ করেন মামুনুল হক। হেফাজতে ইসলামের দাঙ্গাবাজ নেতা যাকে তাকে ‘নবীর দুশমন’ ‘নাস্তিক’ ‘কটূক্তিকারী’ ফতোয়া দিয়ে ‘খতম’ করার উস্কানি দেন। উগ্রবাদীদের হাতে নিহতদের ‘জাহান্নামে পাঠিয়ে দিয়েছে’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। খুনীদের বাহবা দেন ‘জাতীয় বীর’ বলে।

মামুনুলের ওয়াজের ভিডিওক্লিপ দেখে, বিশ্লেষণ করে মানুষ খুনে তার উস্কানির প্রমাণ পাওয়া যায়। দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রকাশ্যে বহু মানুষের সমাবেশে এমন উস্কানি দিয়ে আসছেন তিনি। এসবের সরাসরি প্রভাব পড়ছে তার অনুসারীদের মধ্যে।

ওয়াজ মাহফিল বা ধর্মসভার পরিবেশ সাধারণত শান্ত ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ হয়। মামুনুলের বেলায় এর ঠিক উল্টো। তিনি ওয়াজ মাহফিলকে মুহূর্তেই যুদ্ধের ময়দান বানিয়ে ফেলেন। তার আলোচনায় জীবনবোধ, বেঁচে থাকার অনুভূতি অতি গৌণ। বরং ‘মৃত্যুর পয়গাম’ দিতে বেশি উৎসাহ বোধ করেন। ধর্মের নামে মানুষ মারতে ও মরতে উদ্বুদ্ধ করেন জোরেশোরে। কখনও নবীর দোহাই দিয়ে, কখনও আল্লাহর দোহাই দিয়ে বান্দাকে খুন হতে প্ররোচনা দেন। শুধু বাংলাদেশের মানুষকে নয়, গোটা দুনিয়াকে উদ্দেশ্য করে ওয়াজে তিনি বলেন, ‘পয়গাম শুনে রাখ বিশ্বাসী, সারা দুনিয়ায় যেখানে যে কুলাঙ্গার আমার নবীর ইজ্জতের ওপর আঘাত করবে ওর রক্ত মুসলমানদের জন্য হালাল।’

মানুষ হত্যা করে বড় আত্মতৃপ্তি নিয়ে তিনি নিজেও মরতে চান বলে মাহফিলে জানান মামুনুল। সম্প্রতি আল্লাহর কসম কেটে দ্বিতীয় তৃতীয় স্ত্রী ইস্যুতে মিথ্যা বলা উগ্রবাদী নেতা অনুসারীদের বিভ্রান্ত করতে বলেন, ‘আমি চাই আমি একবার শহীদ হই। আবার আমি জিন্দা হই। আবার শাহাদাতের মৃত্যু বরণ করি। আবার আমাকে জিন্দা করে দেয়া হোক। আমি আমার আল্লার জন্য জীবন দেব। যতবার আমি জীবন পাব প্রতিবার আল্লার জন্য জীবন দেব।’

ফেনীতে ওয়াজ করতে গিয়ে এমন উস্কানি ‘জাগরণ ও চেতনার সৃষ্টি করে’ বলে দাবি করেন তিনি। এ কারণে মামুনুলের বলায় আচরণে অঙ্গভঙ্গিতে কোন ধরনের কোমলতা দেখা যায় না। উগ্রতা উচ্ছৃঙ্খলতা তার ওয়াজের মূল বৈশিষ্ট্য। যুগ যুগ ধরে সব অর্থেই ইসলামকে শান্তির ধর্ম বলা হলেও, ওয়াজে মামুনুল বিষয়টিকে উগ্রবাদী আদর্শের জায়গা থেকে ব্যাখ্যা করেন। বলেন, ‘ইসলাম মানে শান্তি নয়।’ ৩৬ বছর লেখাপড়া করে ইসলাম মানে শান্তিÑ এমন কিছু তিনি কোথাও খুঁজে পাননি বলে দাবি করেন।

অনুমান করা যায়, এ কারণেই কোরআন হাদিসের তরজমা বাদ দিয়ে যুদ্ধের জন্য সুকৌশলে অনুসারীদের প্রস্তুত করেন তিনি। তাদের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে কোন রেফারেন্স ছাড়াই তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আল্লার নবী এমনভাবে ইমানদারকে কমান্ড করতেন নির্দেশ দিতেন মনে হত তিনি একজন সেনা প্রধান। তার সম্মুখে অবস্থিত ইমনাদাররা তার সৈনিক। সেনাপ্রধান তার সৈনিকদের নির্দেশ জারি করতেন। নবীজীর সে কথাগুলোতে সাহাবা কেরামের রক্তে জোস উঠত। আল্লার গয়গম্বরের সে কথাগুলোতে সাহাবায়ে কেরাম শাহাদাতের চেতনায় উজ্জীবিত হতেন। নবীর সেই এক বক্তব্যে জান্নাতের পাগলপারা হয়ে শহীদী মৃত্যুর তামান্না নিয়ে জেহাদের ময়দানে ছুটে যেতেন।’

অনুসারীদের তথাকথিত যুদ্ধে নামার আহ্বান জানিয়ে অন্য এক জায়গায় তিনি বলেন, ‘বাবুনগরীকে সমর্থন করবার জন্য সহযোগিতা করবার জন্য বুকের রক্ত দিতে হলে, ঘাম ঝরাতে হলে অশ্রু ঝরাতে হলে জীবন দিতে হলে কারা কারা প্রস্তুত আছেন? হাত তুলেন।’ আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনুসারীরা স্লোগান তুলেন, ‘ইসলামের শত্রুরা হুঁশিয়ার সাবধান।’

ওয়াজে ঘুরে ফিরেই শাপলা চত্বরে সমবেত হওয়ার হুমকি দিতে দেখা যায়। ২০১৩ সালে মতিঝিলে হেফাজতের চালানো তা-বকে ‘যুদ্ধ’ আখ্যা দিয়ে সমবেতদের কাছে তিনি জানতে চান, ‘যদি আরেকটা যুদ্ধের প্রয়োজন হয় আবার শাপলা চত্বরে যেতে কারা কারা প্রস্তুত?’ জঙ্গী স্লোগান ও হাত তুলে মামুনুলের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার পক্ষে মত দেন অনুসারীরা। এ ধরনের বক্তৃতার সময় উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে মাইক্রোফোন স্ট্যান্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তেও দেখা যায় তাকে।

এর আগে ২০১৩ সালে মতিঝিলের হেফাজতের সমাবেশ থেকে এই নেতা বলেছিলেন, ‘লাশের পর লাশ পড়বে। রক্তের গঙ্গা বইবে।’ বুলেট মোকাবেলা করার জন্য উন্মুক্ত বুকে অপেক্ষা করছেন বলেও হুঙ্কার দিয়েছিলেন তিনি।

মামুনুল যাকে তাকে ‘কটূক্তিকারী’ বলে চিহ্নিত করেন। তার পর হত্যায় উস্কানি দেন। এমন এক ওয়াজে তাকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, ‘কটূক্তি করে কোন দুশমন কল্লা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে না।’ ‘হুজুরের’ আশকারা পেয়ে অনুসারীরা মাহফিলেই স্লোগান দিয়ে ‘কটূক্তিকারী’ খুঁজতে থাকেন। মামুনুল শুধু খুনের নির্দেশনা দিয়ে খ্যান্ত হন না, মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বরতা চালানোর উস্কানি দেন। বলেন, ‘এ দেশের মাটিতে কটাক্ষকারী মাথাচাড়া দিয়ে যদি ওঠে জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে ফেলা হবে।’

ধর্মের নামে খুন করা অপরাধ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, ‘অপরাগ হয়ে নবীর কোন আশেক যদি পাগলপাড়া হয়ে নবীর ইস্ক আর মহাব্বতে সে যদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নবীর কোন দুশমনকে খতম করে দেয় এটা তার অন্যায় নয়। তার অপরাধ নয়।’ উগ্রবাদীদের নিষ্ঠুর হামলায় নিহতদের ‘জাহান্নামে পাঠিয়ে দিয়েছে’ বলে এক ধরনের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায় তাকে। ধর্মের নামে যারা খুন করছে তাদের ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে তুলে ধরেন মামুনুল।

মাদ্রাসার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে জুরি নেই মামুনুলের। সাম্প্রতিক এক ওয়াজে নিজ কর্মীদের মৃত্যুকে ‘জায়েজ’ করার চেষ্টা করে তিনি বলেন, ‘আমাদের মরা আমাদের বাঁচা ডাজন্ট ম্যাটার। গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় নয়। আমরা বাঁচলাম না মরলাম এটা গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় নয়। জীবনের চেয়ে মরন আমাদের কাছে প্রিয় হয়ে যাবে।’

আরেক জায়গায় ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘মুসলমান তুমি যদি আল্লার কাছে প্রিয় হতে চাও, ইমানদার তুমি যদি তোমার ইহকাল এবং পরকালকে সাফল্যম-িত করতে চাও, ইমানদার তুমি যতি তোমার ইহকালীন পরকালীন সফলতা অর্জন করতে চাও তাহলে আমি আল্লার নামে হাজারবার শপথ করে বলতে পারি, আল্লার রসুলের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করবার চেয়ে আল্লার প্রিয় পাত্র হওয়ার মতো আর কোন নিশ্চয়তাদানকারী পথ নেই।’

মামুনুল কীভাবে কর্মীদের যুদ্ধে নামান তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের সাম্প্রতিক হরতালে। হেফাজতের ডাকা হরতালে এক মাদ্রাসা ছাত্র ঘোড়ায় চড়ে তরবারি হাতে রাস্তায় নেমে হৈচৈ ফেলে দেন। অভিনব এই ছবি দেখে মানুষ হতবাক হয়ে যান। উৎসব খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, এর পেছনেও রয়েছে মামুনুলের উস্কানি। এক ওয়াজে আল্লার নবীর হাদিস তালাশ করার দাবি করে মামুনুলকে বলতে শোনা যায়, শেষ যুগে একদল অশ^ারোহী বাহিনী তৈরি হবে। তৈরি হয়ে গেছে। যাদের হাতে সারা দুনিয়াব্যাপী কালিমার পতাকা উড়বে।’ মামুনুলের এ ধরনের কল্পকাহিনী শুনেই ওই যুবক মাঠে নেমেছিল বলে ধারণা করা হয়।

এভাবে দিনের পর দিন ধরে ধর্মের নামে মানুষ খুনের উস্কানি দিয়ে আসছেন মামুনুল হক। ২০১৩ সালের পর দেশে কয়েকজন ব্লগার লেখক প্রকাশক শিক্ষককে খুন করা হয়েছে। ধর্ম অবমাননার নামে এই সব নিষ্ঠুর হত্যাকা- চালানো হয়। হত্যাকা-সহ সাম্প্রতিক সব তা-বে মামুনুল হকের সবচেয়ে বেশি উস্কানি ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

nineteen + eight =