Templates by BIGtheme NET
২১ আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৬ ভাদ্র, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১২ মহর্‌রম, ১৪৪৩ হিজরি

খেলার মাঠের অধিনায়ক থেকে বাঙালি জাতির নায়ক বঙ্গবন্ধু

প্রকাশের সময়: জুলাই ১৫, ২০২১, ৭:১০ অপরাহ্ণ

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের অজপাড়াগাঁ টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের ঘর আলো করে জন্ম নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছেলেবেলা থেকেই তাকে প্রবলভাবে টানত মাঠ। ক্রীড়াপ্রেম ছিল তার সহজাত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাই ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে তিনি নিয়েছেন যুগোপযোগী পরিকল্পনা ও সময়োপযোগী সব পদক্ষেপ।

সর্বক্ষেত্রে তার সময়োচিত সিদ্ধান্তগুলোই আজ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সাফল্যের শিখরে। খেলাধুলার প্রতি ঝোঁক থেকেই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু দৃষ্টি দিয়েছেন ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে। ১৯৭২ সালে তিনি গঠন করেন বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড, যা বর্তমানে পরিচিত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নামে। শুধু তাই নয়, ক্রীড়ার সমন্বয় ও সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য ওই বছরই প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। এটি এখন পরিচিত জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) হিসেবে, যা বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা।

এ সংস্থাই এখন বাংলাদেশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রায় ৪৫টি খেলাধুলা বিষয়ক পৃথক সংস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। যার মধ্যে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) অন্যতম। দেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ এই সংস্থা বাফুফেও প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ১৯৭২ সালে।

ক্রীড়াঙ্গনের সার্বিক বিকাশের প্রয়োজনীতা অনুভব করে বঙ্গবন্ধু গঠন করেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখায় তিনি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্যদের জন্য চাকরির সুব্যবস্থা করে দেন এবং তাদের সার্বিক দায়িত্ব নেন।

বঙ্গবন্ধুর ক্রীড়ান্নোয়নের পথচলা থামেনি এখানেই। ক্রীড়াবিদদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়ে তিনি ‘বাংলাদেশ স্পোর্টস কাউন্সিল আইন’ পাশ করেন। খেলোয়াড় ও তাদের পরিবারের পাশে থাকার স্বার্থে এবং সার্বিক সহযোগিতা দেওয়ার লক্ষ্যে ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ পরিষদ’ নামে একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেন তিনি ১৯৭৫ সালের ৬ আগস্ট। কিন্তু পরিবারসহ তাকে নির্মমভাবে হত্যার পর সেটির বাস্তবায়ন থেমে যায়। তবে প্রায় চার দশক পর, বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালে ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ পরিষদ, আইন ২০১১’ পাশ করিয়ে আনেন এবং বর্তমানে সেই আইনের ধারার প্রয়োগ হচ্ছে বিভিন্নভাবে।

সব খেলার প্রতি ভালোবাসা ছিল বঙ্গবন্ধুর। তবে, ফুটবলের প্রতি ঝোঁক ছিল একটু বেশি। ফুটবল মাঠ মাতানোর পাশাপাশি ভলিবল এবং হকিতেও নিজের সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।

ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও বঙ্গবন্ধু

স্কুল-কলেজের মাঠ তো বঙ্গবন্ধু দাঁপিয়ে বেড়িয়েছেনই, আলো ছড়িয়েছেন আরো বড় পরিসরেও। খেলেছেন তৎকালীন বিখ্যাত পূর্ব পাকিস্তান ঢাকা লীগের সফল ক্লাব ‘ঢাকা ওয়ান্ডারার্স’-এ। জেলা দলের হয়ে নানান টুর্নামেন্ট অংশ নেওয়ার পর ১৯৪১ সালে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে তিনি যোগ দেন স্ট্রাইকার হিসেবে।

পরবর্তীতে দুই বছর নিয়মিত দ্বিতীয় বিভাগে খেলেছেন। অধিকাংশ সময় ৯ বা ১০ নম্বর জার্সিই পরতেন। দলটির অধিনায়কত্বও করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে ওয়ান্ডারার্স ক্লাব বগুড়ায় অনুষ্ঠিত একটি টুর্নামেন্টে জয়লাভ করে। টুর্নামেন্টের ফাইনালে জোড়া গোল করে তিনিই ছিলেন নায়ক।

ওয়ান্ডারার্সের বিখ্যাত ফুটবলার আমির জং গজনবী বঙ্গবন্ধুর খেলা দেখে বলেছিলেন, ‘তিনি যদি রাজনীতিতে না জড়িয়ে খেলা চালিয়ে যেতেন, তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবেই এশিয়ার প্রথম সারির একজন স্ট্রাইকার পেতাম।’

শুধু ফুটবলেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি বঙ্গবন্ধু। পাশাপাশি ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ভলিবল ও হকি দলেরও সদস্য ছিলেন।

স্কুল জীবনের খেলাধুলার স্মৃতি

বঙ্গবন্ধু ছেলেবেলা থেকেই ফুটবল খেলতেন। খেলাধুলা তার হৃদয়ের কতটা জুড়ে ছিল, সেটির নমুনা কিছুটা পাওয়া যায় ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তে। তিনি লিখেছেন,

আমি আস্তে আস্তে রাজনীতির মধ্যে প্রবেশ করলাম। আব্বা আমাকে বাঁধা দিতেন না, শুধু বলতেন, লেখাপড়ার দিকে নজর দেবে। লেখাপড়ায় আমার একটু আগ্রহও তখন হয়েছে। কারণ, কয়েক বৎসর অসুস্থতার জন্য নষ্ট করেছি। স্কুলেও আমি ক্যাপ্টেন ছিলাম। খেলাধুলার দিকে আমার খুব ঝোঁক ছিল। আব্বা আমাকে বেশি খেলতে দিতে চাইতেন না। কারণ আমার হার্টের ব্যারাম হয়েছিল। আমার আব্বাও ভাল খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি অফিসার্স ক্লাবের সেক্রেটারি ছিলেন। আর আমি মিশন স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিলাম। আব্বার টিম ও আমার টিমে যখন খেলা হতো, তখন জনসাধারণ খুব উপভোগ করত। আমাদের স্কুল টিম খুব ভালো ছিল। মহকুমায় যারা ভাল খেলোয়াড় ছিল, তাদের এনে ভর্তি করতাম এবং বেতন ফ্রি করে দিতাম।’

১৯৪০ সালে আব্বার টিমকে আমার স্কুল টিম প্রায় সকল খেলায় পরাজিত করল। অফিসার্স ক্লাবের টাকার অভাব ছিল না।খেলোয়াড়দের বাইরে থেকে আনত। সবই নামকরা খেলোয়াড়। বৎসরের শেষ খেলায় আব্বার টিমের সাথে আমার টিমের পাঁচ দিন ড্র হয়। আমরা তো ছাত্র; এগারজনই রোজ খেলতাম, আর অফিসার্স ক্লাব নতুন নতুন প্লেয়ার আনত। আমরা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। আব্বা বললেন, “কাল সকালেই খেলতে হবে। বাইরের খেলোয়াড়দের আর রাখা যাবে না, অনেক খরচ।”

আমি বললাম, “আগামীকাল সকালে আমরা খেলতে পারব না, আমাদের পরীক্ষা।” গোপালগঞ্জ ফুটবল ক্লাবের সেক্রেটারি একবার আমার আব্বার কাছে আর একবার আমার কাছে কয়েকবার হাঁটাহাঁটি করে বললেন, ‘তোমাদের বাপ-ব্যাটার ব্যাপার, আমি বাবা আর হাঁটতে পারি না।”

আমাদের হেডমাস্টার তখন ছিলেন বাবু রসরঞ্জন সেনগুপ্ত। আমাকে তিনি প্রাইভেটও পড়াতেন। আব্বা হেডমাস্টার বাবুকে খবর দিয়ে আনলেন। আমি আমার দলবল নিয়ে এক গোলপোস্টে আর আব্বা তার দলবল নিয়ে অন্য গোলপোস্টে। হেডমাস্টার বাবু বললেন, ‘মুজিব, তোমার বাবার কাছে হার মানো। আগামীকাল সকালে খেল, তাদের অসুবিধা হবে।’ আমি বললাম ‘স্যার, আমাদের সকলেই ক্লান্ত, এগারজনই সারা বছর খেলেছি। সকলের পায়ে ব্যথা, দুই-চার দিন বিশ্রাম দরকার। নতুবা হেরে যাব।’ এ বছর তো একটা খেলায়ও আমরা হারি নাই, আর ‘এ জেড খান শিল্ডের’ এটি ফাইনাল খেলা। হেডমাস্টার বাবুর কথা মানতে হলো। পরের দিন সকালে খেলা হলো। আমার টিম আব্বার টিমের কাছে এক গোলে পরাজিত হলো।

স্বাধীন দেশে প্রথম টুর্নামেন্ট আয়োজন

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সেই ম্যাচের সাক্ষী আজকের বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। দেশের তখনকার তারকা ফুটবলারদের সমন্বয়ে ম্যাচটি আয়োজিত হয়। বাংলাদেশ একাদশ ও রাষ্ট্রপতি একাদশের মধ্যে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭২ সালের মে মাসে, ঢাকায় খেলতে আসে ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা দল কলকাতা মোহনবাগান। প্রথম ম্যাচে কলকাতা মোহনবাগান ঢাকা মোহামেডানকে হারালেও, পরের ম্যাচে হারতে হয়েছিল সফরকারীদের।

মাঠে উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু নিজেই। ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের উজ্জ্বীবিত করেছেন। প্রথম হারের পর খেলোয়াড়দের মনোবল চাঙ্গা করেছেন। সেই ম্যাচ ১-০ ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল ঢাকা মোহামেডান। সেই ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচে গোল করেছিলেন এখনকার বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দীন।

দেশের ফুটবলকে পরিচিত করতে আন্তর্জাতিক ক্লাবকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৩ সালে রাশিয়ার মিন্স্ক ডায়নামো ক্লাবকে নিয়ে আসেন ঢাকায়, প্রীতি ম্যাচ খেলার জন্য। ছোট ছেলে শেখ রাসেলকে নিয়ে সেবার ভিআইপি গ্যালারিতে বসে ঢাকা একাদশ ও রাশিয়ার দলটির খেলা উপভোগ করেছেন তিনি।

খেলোয়াড়দের প্রতি তার যে বিশেষ ভালোবাসা আছে, সেটা বিভিন্ন সময় প্রকাশ করেছেন তিনি। ১৯৭৫ সালে মালয়েশিয়ার মারদেকা ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলতে গিয়েছিল বাংলাদেশ ফুটবল দল। তার আগে খেলোয়াড়দের গণভবনে ডেকেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যাওয়ার আগে ফুটবলারদের সঙ্গে ছবিও তুলেছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এই বাঙালি।

শুধু বঙ্গবন্ধুই নন, তার পরিবারের অন্য সদস্যরাও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শেখ কামাল ও শেখ জামাল দেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে বড় অবদান রেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালকে বলা হয় স্বাধীন বাংলার আধুনিক ক্রীড়াক্ষেত্রের অগ্রদূত। বঙ্গবন্ধুর পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ছিলেন দেশসেরা অ্যাথলেট। এখন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন।

একজন খেলোয়াড় হিসেবে আমরা বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেখেছি, কিভাবে তিনি পরম মমতায় আমাদের আগলে রাখেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে গিয়ে গ্যালারিতে বসে আমাদের খেলোয়াড়দের তিনি উৎসাহ জোগান। আমাদের বিজয়ে তিনি অভিনন্দন জানান সবার আগে, আর পরাজয়ে মনোবল ধরে রেখে ভবিষ্যতে ভালো করার অনুপ্রেরণা দেন। বর্তমান বাংলাদেশের ক্রিকেট তথা সমগ্র ক্রীড়াঙ্গনের আকাশ ছোঁয়ার অনুপ্রেরণা ও শক্তি বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি,ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই অকৃত্রিম ভালোবাসার উৎস জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের এই ভালোবাসা, আমাদের ক্রীড়াঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছে; এগিয়ে নিচ্ছে সুস্থ সুন্দর প্রজন্ম গড়ার প্রত্যয়ে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী-মুজিববর্ষে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

nineteen − nine =