Templates by BIGtheme NET
১৯ আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৪ ভাদ্র, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১০ মহর্‌রম, ১৪৪৩ হিজরি

বঙ্গবন্ধুর ভরাট কণ্ঠস্বর এখনো সাহস জোগায়

প্রকাশের সময়: আগস্ট ৮, ২০২১, ২:১৮ অপরাহ্ণ

ডা. সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি :

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শৈশবে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। দীর্ঘকায় বিশাল হৃদয়ের এই মানুষটি বাংলার কোটি কোটি জনতার মতো আমাকেও বিশেষভাবে আলোড়িত করে, উদ্দীপনা জাগায়, উদার হতে শেখায়। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অসংখ্য লেখা পড়েছি, আলোচনা অনুষ্ঠান শুনেছি। ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষের বহুমাত্রিক গুণাবলির পরিচয় পেয়ে বিস্মিত হয়েছি। তাঁকে জানার শেষ নেই। কিন্তু তার পরও ছোটবেলায় বঙ্গবন্ধুর একেবারে কাছে যেতে পারার অভিজ্ঞতা আমাকে ভীষণভাবে শিহরিত করে এবং কিছু টুকরো ঘটনা হৃদয়ে ব্যাপকভাবে নাড়া দেয়।

রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম আমার। আমাদের বৈঠকখানার দেয়ালে আব্বার (সৈয়দ নজরুল ইসলাম) নেতা বঙ্গবন্ধুর একটা বড় ছবি টাঙানো ছিল। এটি দেখেই আমরা বড় হয়েছি। ছবির এই ব্যক্তিটির সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার স্মৃতি বেশ মনে আছে। খুব সম্ভবত ১৯৭১ সালে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কিছু সময় আগের ঘটনা। একদিন আব্বা আমাদের জানালেন যে পরদিন আমরা সবাই মধুপুর যাব বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। আমি ছোটবেলায় কিছুটা চঞ্চল প্রকৃতির ছিলাম। তাই তর আর সইছিল না। সকালবেলায়ই জিপে চড়ে আব্বা-আম্মার সঙ্গে আমরা দুই বোন মধুপুর গড়ের একটি বাংলোয় পৌঁছলাম। সেখানেই আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখার সুযোগ পাই। তিনি বড় একটি ঘরে চেয়ারে বসে ছিলেন। ঘুরেফিরে তাঁকে দেখেছি। হয়তো বা তাঁর মুখের আদলের সঙ্গে আমাদের বৈঠকখানার ছবিটার সাদৃশ্য খোঁজার চেষ্টা করছিলাম। ভাবতে খুব ভালো লাগে যে শিশু বয়সে বিমুগ্ধ নয়নে দেখা সেই মানুষটিই আমাদের জাতির পিতা। যিনি আমাদের একটি দেশ উপহার দিয়েছেন, দিয়েছেন জাতিসত্তার পরিচয়।

সেদিনের আরেকটি মজার ঘটনা না বলে পারছি না। বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলে শেখ রাসেলও এসেছিল সেই বাংলোয়। ওর কাছে বেশ কয়েকটা কাগজের তৈরি ছোট ছোট বাংলাদেশের পতাকা ছিল। রাসেলের পেছন পেছন আমরা দুই বোন সেই পতাকা হাতে নিয়ে মিছিল করেছিলাম। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বাংলোর চারদিকে ঘুরেছিলাম বেশ কয়েকবার। কিছু বোঝার বয়স হয়নি তখনো। তবে আমরা যে খুব ভালো কিছু করছি তেমনই একটা অনুভূতি হয়েছিল সেদিন। এর কিছুদিন পরই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে, কোনোমতে প্রাণ নিয়ে আমরা আগরতলা হয়ে কলকাতায় পৌঁছাই। কলকাতার পার্ক সার্কাসে প্রবাসী সরকারের বাসভবন ছিল। আমার নিজের চোখে দেখা বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ কলকাতার বাসভবনে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টাতেই বেজে চলত। এটিই ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম মূল প্রেরণা।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। পূর্ণতা পায় দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। আমরা সেদিন সকালবেলায় শাহবাগের সবচেয়ে উঁচু ভবন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে চলে গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর মিছিল তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে এই পথ দিয়েই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাবে। অস্থিরভাবে হোটেলের জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি কখন তাঁকে দেখা যাবে। অবশেষে সেই সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলো। জনতার মহাসমুদ্রের মাঝে একটি খোলা গাড়িতে তিনি আবির্ভূত হলেন, অনেকটা যেন রূপকথার বাঁশিওয়ালার মতো। পেছনে আক্ষরিক অর্থেই শুধু মানুষ আর মানুষ। তিনি ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল, বোধ করি কিছুটা ক্লান্ত। তাঁর পাশে আরো কয়েকজনের সঙ্গে আমার পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলামও ছিলেন। সেদিনের সেই বিশেষ মুহূর্তটুকুর সাক্ষী হওয়া আমার জীবনের একটা পরম পাওয়া। বিখ্যাত এই ভিডিও ফুটেজ যতবার দেখি ততবারই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ি। একটা আনন্দমিশ্রিত অব্যক্ত কান্না আমাকে গ্রাস করে।

স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু বারকয়েক আমাদের বাসায় এসেছেন। ১৯৭৩-৭৪ সালের ঘটনা। আমরা তখন মিন্টো রোডে উপরাষ্ট্রপতির বাসভবনে থাকি। একদিন হঠাৎ করেই দেখলাম বাড়িতে উৎসব উৎসব পরিবেশ। চারদিকে হৈচৈ, দৌড়াদৌড়ি। কিছুক্ষণ পরেই বঙ্গবন্ধু সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন। ‘হাজি সাহেব কোথায়’ বলে আম্মার খোঁজ করতে লাগলেন। কিছুদিন আগেই আম্মা হজ করে এসেছেন। তাঁর মানত ছিল দেশ স্বাধীন হলেই তিনি মক্কায় যাবেন। রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি আমাদের বাড়িতে চলে এসেছেন কোনো রকম পূর্বপরিকল্পনা ও আড়ম্বর ছাড়াই। আমাদের দুই বোনের চোখে তখন রাজ্যের বিস্ময়! আনন্দ আর ধরে না। প্রজাপতির মতো তাঁকে ঘিরে রেখেছি। ব্যাপারটি আমাকে এখনো ভীষণভাবে অবাক করে—বঙ্গবন্ধুর মতো একজন অসাধারণ ব্যক্তি কী করে অতি সাধারণ মানুষের মতো আচরণ করতেন। এত বড় তুমুল জনপ্রিয় নেতা, তবু তাঁর চালচলন ছিল একেবারে স্বাভাবিক। যতক্ষণ তিনি বাসায় থাকতেন ততক্ষণই তাঁকে ঘিরে একটা উদ্দীপনা আর আনন্দ অনুভূত হতো। মহাপুরুষদের চারধারে যে ‘আলোকবর্তিকা’ থাকে ব্যাপারটা সম্ভবত সে রকমই। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে জাতির জনকের বাসভবনে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে অনেকবার। তাঁর শয়নকক্ষে প্রিয় নাতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপার পুত্র জয়কে বুকে নিয়ে শুয়ে থাকতে দেখেছি। কী অসাধারণ সেই দৃশ্য। মাঝেমধ্যে আমরা কাছে যেতাম, তিনি এটা-সেটা বলতেন—বড় আন্তরিক ছিল তাঁর কথাবার্তা। এখনো সেই ভরাট গলার স্বর আমাকে উদ্দীপনা জোগায়।

বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ঘিরে তিনটি বিয়ের স্মৃতি খুব মনে বাজে। প্রথম বিয়েটি আমার মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর খালাতো বোনের। সময়টা সম্ভবত ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি। আম্মার সঙ্গে আমরা দুই বোন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে গিয়েছি। চাচির (বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব) সঙ্গে কথা বলার সময় আম্মার চোখ পড়ল জেলী ভাবির দিকে। পরিচয় জানার সঙ্গে সঙ্গেই আম্মা তাঁকে বললেন যে তাঁর এক ভাতিজার সঙ্গে মেয়েটিকে বেশ মানাবে। তখন অল্পস্বল্প বুঝতে শিখেছি। তাই আমরাও বেশ খুশি। কিছুদিনের মধ্যেই বিয়েটা হয়ে গেল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যখন সবাই ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত—তখন এই বিয়েটি আমাদের মধ্যে একটা আনন্দের আবেশ তৈরি করেছিল। ১৯৪৭ সালে সিলেটের এক সম্মেলন থেকেই আমার পিতা ও বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক সহকর্মী। এই বিয়ের মাধ্যমে দুই পরিবারের মধ্যে একটি আত্মীয়তার সম্পর্কও স্থাপিত হয়। অন্য যে দুটি বিয়ের কথা মনে আছে, তা হলো বঙ্গবন্ধুর দুই ছেলে শেখ কামাল ও শেখ জামাল ভাইয়ের বিয়ে। তখন দেশে খাদ্যের অভাব, চারদিকে দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজ করছে। বড় কোনো বিয়ে কিংবা আড়ম্বরপূর্ণ খাওয়াদাওয়ার অনুষ্ঠান সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। বিয়ের দাওয়াতে পোলাউয়ের বদলে সাদামাটা খাবারের আয়োজন ছিল। আমার খুব আশাভঙ্গ হয়েছিল। বাসায় ফিরে আম্মার কাছে সে অনুভূতি প্রকাশ করতে দ্বিধা করিনি। মজার ব্যাপার হলো—বিয়ের খাবারের এমন সাধারণ মেন্যু আর কোথাও আমার চোখে পড়েনি। পরিণত বয়সে এসে আমার কাছে বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি তাঁর নিজের দুই পুত্রের ব্যাপারেও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাননি। এটি বোধ হয় শুধু তাঁর পক্ষেই সম্ভব।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরবেলার কথা এখনো স্পষ্ট মনে করতে পারি। খুব সকালে সূর্যোদয়েরও আগে আমাদের ঘুম ভেঙে যায় প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দে। দেখি আব্বা বারান্দায় পায়চারি করছেন, আম্মাও ভীষণ উদ্বিগ্ন। প্রথমে ভাবছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের আতশবাজির শব্দ। কিন্তু এটি যে বাঙালি জাতির দীর্ঘতম অমানিশার শুরু তা কেউ তখনো ভাবতে পারেনি। এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আমার পিতাকে হত্যা করা হয়। জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে এই দিন কারাগারের ভেতর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। মনে আছে একবার বঙ্গবন্ধু আমাদের দেখে আব্বাকে বলেছিলেন, ‘নজরুল সাহেব, আপনার মেয়ে দুটি কবে বড় হবে?’ পিতাকে হারাবার পর, নানান বৈরিতায় আমরা যেন হঠাৎ করেই বড় হয় গেলাম।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি আর তাঁরই সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে বীরদর্পে। বাঙালি আজ আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে। এই শোকের মাসে, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে সবার মতো আমারও দীপ্ত অঙ্গীকার—হে পিতা, তুমি ঘুমাও, আমরা জেগে আছি, আমরা তোমার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হব না। ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাব না, ঠিক যেমনটি তুমি আমাদেরকে শিখিয়েছ।

লেখক : সংসদ সদস্য, কিশোরগঞ্জ-১; স্বাধীন বাংলাদেশের

প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের কন্যা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

9 + sixteen =