Templates by BIGtheme NET
২ জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ পৌষ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৮ জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

চট্টগ্রামে নতুন বছরে চালু হচ্ছে আট মেগা প্রকল্প

প্রকাশের সময়: জানুয়ারি ২, ২০২২, ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রামে নতুন বছরেই চালু হচ্ছে ৮ মেগা প্রকল্প। এগুলো হচ্ছে- কর্ণফুলী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল, বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প, আউটার রিং রোড, ভান্ডালজুড়ি পানি শোধনাগার প্রকল্প এবং বায়েজিদ বাইপাস সড়ক। শেষের পথে রয়েছে চাক্তাই-কালুরঘাট রোড, শুরুর পথে বে-টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, মিনি সেক্রেটারিয়েট ফর চট্টগ্রাম প্রকল্প।
কর্ণফুলী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল : কর্ণফুলীর তলদেশে নির্মিত হচ্ছে উপমহাদেশের প্রথম টানেল। এ প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। দুই টিউবের খনন কাজ ইতোমধ্যে শেষ। চলছে সংযোগ সড়কের কাজ। টানেল প্রকল্পের পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী জানান, এখন আনোয়ারা ও পতেঙ্গা প্রান্তে ৫.৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়কের কাজ চলছে। তিনি বলেন, প্রায় ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে ঋণ হিসেবে চীনের এক্সিম ব্যাংক দিচ্ছে ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। অবশিষ্ট অর্থের জোগান হয়েছে সরকারি তহবিল থেকে।
প্রকল্প কাজের বিবরণে দেখা যায়, মূল টানেলের দৈর্ঘ্য ৩.৩২ কিলোমিটার। এর মধ্যে টানেলের প্রতিটি সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য ২.৪৫ কিলোমিটার। দুই সুড়ঙ্গে দুটি করে মোট চারটি লেন থাকবে। মূল টানেলের সঙ্গে পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ৫.৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক থাকবে। আর আনোয়ারা প্রান্তে রয়েছে ৭২৭ মিটার দীর্ঘ উড়ালসেতু।
চীনের সাংহাইয়ের আদলে চট্টগ্রামকে ওয়ান সিটি টু টাউন হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। এটা প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের অন্যতম। প্রকল্প ঘিরে ইতোমধ্যে পতেঙ্গা ও আনোয়ারা এলাকায় বিশেষ অর্থনীতি অঞ্চলসহ নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে।
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পও সমাপ্তির দিকে : চট্টগ্রাম মহানগরীর দুঃখ জলাবদ্ধতা, যা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে প্রায় ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন হচ্ছে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) তত্ত্বাবধানে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনী যা চলতি বছর শেষ হওয়ার কথা। চউকের নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩৬টি খাল ও ৩০২ মিটার নালা সংস্কার করছে চউক। ২০১৭ সালের জুুলাই মাসে শুরু করা এ প্রকল্পের কাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। পুরো কাজ শেষ হলে জলাবদ্ধতা নিরসন হবে।
শেষ হবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প : যানজট নিরসনে চট্টগ্রামের লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ প্রকল্প চউকের হাতে। ২০১৭ সালে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।
প্রকল্পের পরিচালক ও চউকের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান বলেন, নতুন বছরের মধ্যে প্রকল্পের মূল কাজ শেষ হবে। এরপর যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। তবে র‌্যাম ও লুপের কাজ শেষ হতে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। চউকের তথ্যমতে, প্রায় তিন হাজার ৩২০ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
উৎপাদনে যাচ্ছে বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র : চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যাচ্ছে নতুন বছরেই। এটি বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প। এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার লিমিটেড ও চীনের দুটি প্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পের কর্মকর্তা আদিলুর রহমান জানান, ২০১৬ সালের মার্চ মাসে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। নতুন বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।
ওয়াসার স্যুয়ারেজ ও পানি শোধনাগার প্রকল্প : চলতি বছরের শুরুতে নগরীর হালিশহরে ১৬৫ একর জায়গায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্প চালু হওয়ার কথা। অপরদিকে কর্ণফুলীর তীরে বোয়ালখালীতে দিনে ৬ কোটি লিটার ধারণক্ষমতার ভান্ডালজুড়ি পানি শোধনাগার প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে।
ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম ফজলুল্লাহ এ তথ্য জানিয়ে বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে পটিয়া, আনোয়ারা, বোয়ালখালী এলাকার আবাসিক ও শিল্প কারখানায় সুপেয় পানি সরবরাহ করা যাবে।
চালু হচ্ছে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল : চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) চালু হচ্ছে নতুন বছরের জুন মাসে। ২০০৭ সালের পর এই প্রথম কোনো জেটি টার্মিনাল বন্দরের বহরে যোগ হচ্ছে।
বন্দর সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ১৩ জুন পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের অনুমোদন দেয় সরকার। ১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের শেষ সময় ছিল ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরে ব্যয় আরও ১ হাজার ৩৯৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাবের সঙ্গে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যস্ত সময় চেয়ে আরডিপি বরাবর আবেদন করে প্রকল্প সংস্থা।
চালু হচ্ছে আউটার রিং রোড : পতেঙ্গা থেকে সাগরিকা পর্যন্ত সাগরের পাড় ঘেঁষে আউটার রিং রোডের কাজ শেষ হলেও দুটো ফিডার রোড চালু হয়নি এখনও। তবে নতুন বছরের মধ্যে এ কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের পরিচালক ও চউকের প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস।
তিনি বলেন, ফিডার রোড-৩ (সাগরিকা স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে) এর নির্মাণ প্রায় শেষ। শিগগিরই তা চালু হয়ে যাবে। অপরদিকে ফিডার রোড-১ (পতেঙ্গা খেজুরতলা অংশে) এর নির্মাণকাজ চলতি বছরের মধ্যে শেষ হবে।
চালু হবে বায়েজিদ বাইপাস রোড : প্রায় এক বছর আগে শেষ হয়েছে এই প্রকল্পের কাজ। তবে পরিবেশ অধিদফতরের নির্দেশনা ও রেললাইনের ওপর ব্রিজ নির্মাণে রেলওয়ের গাইড লাইনে আটকে রয়েছে চার লেনের বাইপাস রোডটি।
রোডটি সব বাধা অতিক্রম করে চলতি বছরে পুরোদমে চলাচলের উপযোগী হবে বলে জানান চউকের প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস। তিনি বলেন, ৩৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয়ে চার লেন এই সড়কের কাজ শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালে। এখন সকল বাধা দূর করে চলতি বছর মার্চ মাসে চালু করা হবে এ সড়ক।
শেষের পথে চাক্তাই কালুরঘাট সড়ক : এদিকে শেষের পথে রয়েছে চাক্তাই কালুরঘাট সড়কের কাজও। কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে চাক্তাই থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত প্রায় আট কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের এই সড়কের ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
প্রকল্পের পরিচালক ও চউকের নির্বাহী প্রকৌশলী রাজীব দাশ বলেন, ২০২২ সাল শেষে প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষের পথে থাকবে। তবে সম্পূর্ণ শেষ হতে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বাকলিয়া, চান্দগাঁও ও কালুরঘাট অংশে অভূতপূর্ব উন্নয়ন কার্যক্রম হবে।
শুরু হচ্ছে বে-টার্মিনাল প্রকল্প : দেশের আমদানি-রফতানির ৯৩ শতাংশ পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়াতে হাতে নেওয়া হয়েছে বে-টার্মিনাল প্রকল্প।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্মকর্তাদের মতে, সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ প্রায় ২৩০০ একর ভূমিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আগামীর বন্দর বলে খ্যাত বে-টার্মিনাল বাস্তবায়নের কাজ করছে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র প্রকল্প : মহেশখালীতে নির্মাণ হতে যাওয়া মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ এ বছরেই পুরোদমে শুরু হবে। ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষে এখন ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদানের বাকি রয়েছে। আর তা শেষ হলেই কাজ শুরু করতে আর বাধা নেই। প্রকল্পের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রবন্দরের যুগে প্রবেশ করবে দেশ।
মিনি সেক্রেটারিয়েট ফর চট্টগ্রাম : উন্নয়নে এশিয়ার টাইগার হিসেবে খ্যাত মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ার আদলে নির্মিত হতে যাচ্ছে মিনি সেক্রেটারিয়েট ফর চট্টগ্রাম।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমান বলেন, কর্ণফুলী নদী লাগোয়া হামিদচরে ১১০ একর জমিতে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। এখানে ৪৪টি সরকারি দফতর ছাড়াও বিভিন্ন স্থাপনা থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

2 × four =