Templates by BIGtheme NET
১২ জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ২৮ পৌষ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৮ জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

আইভী-তৈমুরের পালটাপালটি

প্রকাশের সময়: জানুয়ারি ১২, ২০২২, ৯:২১ পূর্বাহ্ণ

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই মেয়র প্রার্থী-সরকারি দলের ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও স্বতন্ত্র অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার বিভিন্ন বিষয়ে পলটাপালটি অবস্থান নিয়েছেন। এতে নগরীতে উৎসবমুখর পরিবেশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে নানা শঙ্কাও। এছাড়া জেলার প্রভাবশালী নেতা একেএম শামীম ওসমান এমপিকে নিয়ে এখনো থামেনি বাগযুদ্ধ। আলোচনায় আছে নির্বাচনি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ)। ১৬ জানুয়ারি হবে নাসিকের ভোট।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তৈমুর আলম খন্দকার। সরকারি দলের প্রার্থীকে সুবিধা দিতে প্রশাসন কাজ করছে-এমন অভিযোগ তার। তবে নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী।

তৈমুরের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হতে পারে এটা তার (তৈমুর) নতুন কৌশল বা চাল। এদিকে তৈমুরের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে প্রশাসন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসন জিরো টলারেন্স (শূন্য সহিষ্ণুতা) নীতিতে আছে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার।

আর রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহফুজা আক্তার বলেন, নির্বাচনি পরিবেশ এখন পর্যন্ত ভালো আছে। আমাদের কাছে যেসব অভিযোগ এসেছে অথবা অন্য কোনোভাবে আমরা আচরণবিধি লঙ্ঘনের খবর পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।

নাসিক নির্বাচনে গণসংযোগ শুরু হওয়ার পর থেকে নানা বিষয়ে উত্তাপ ছড়াতে থাকে। ক্ষমতাসীন দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী একে অপরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেন। তাদের এ অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জেলার প্রভাবশালী নেতা একেএম শামীম ওসমান এমপি।

তাকে গডফাদার আখ্যায়িত করে আইভী ইতোমধ্যেই বলেছেন, তৈমুর গডফাদার শামীম ওসমানের প্রার্থী। এরপর সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে নৌকার পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দেন শামীম ওসমান। তার এমন ঘোষণাও শামীম ও আইভীর মধ্যে এখনো বরফ গলেনি বলে মনে করছেন অনেকেই।

এমন পরিস্থিতিতে গত কয়েক দিন ধরেই শামীম ওসমান, আইভী ও তৈমুর-এ তিনজনকে নিয়ে বেশ উত্তপ্ত ছিল নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গন। কিন্তু রোববার রাতে জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ও সিদ্ধিরগঞ্জে তৈমুরের নির্বাচনি সমন্বয়ক মনিরুল ইসলাম রবিকে গ্রেফতারের পর পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।

এ ছাড়া ওই রাতে বিএনপির কয়েক নেতার বাড়িতে তল্লাশি ও বন্দর এলাকা থেকে ১৭ জনকে আটক করা হয় বলে দাবি করেন তৈমুর আলম। হঠাৎ করে নেতাকর্মীদের বাড়িতে পুলিশি তল্লাশি ও কয়েকজনকে আটকের পর পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন তৈমুর সমর্থকরা। আলোচনায় আসে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড।

এ প্রসঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার অভিযোগ করেন, আমি এই নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও শুরু থেকে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা হচ্ছে না। অনেক সংসদ-সদস্য এসে নৌকার পক্ষে ভোট চাইছেন, যা আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে বারবার অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তত খারাপের দিকে যাচ্ছে। নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও বাড়ি বাড়ি তল্লাশির নামে এলাকায় একটা ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে।

নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে একটি মহল এ অপচেষ্টায় লিপ্ত। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি। তবে সুষ্ঠু ভোট হলে যে কোনো ফল মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তৈমুর।

তবে তৈমুরের এসব অভিযোগ আমলে নিচ্ছেন না ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী। বর্তমান পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্টির পাশাপাশি আগামী দিনে যাতে এ ধারা অব্যাহত থাকে সেই প্রত্যাশা করেছেন তিনি।

তৈমুর আলমের অভিযোগ প্রসঙ্গে আইভী বলেন, কেন তিনি অভিযোগ করছেন জানি না। এটা তার নতুন চাল কিনা জানি না। হতে পারে তার এটা নতুন কৌশল কিংবা চাল। নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করার মতো লোকবল বা প্রশাসন আমার নেই।

নিশ্চয়ই প্রতিটি নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনের একটা কৌশল থাকে। তারা কী করছে আমি জানি না। আমি কখনো নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করি না। ভোট নিয়ে আমরা দুজন প্রচার চালাচ্ছি। এর বাইরে কী হচ্ছে তা আমি জানি না, জানতে চাইও না।

তিনি বলেন, আমি অবশ্যই চাইব নারায়ণগঞ্জের পরিবেশ সুন্দর থাকুক। প্রশাসন যেন নিরপেক্ষ ও সক্রিয় থাকে। ভোটাররা যেন ভোট দিতে যেতে পারে সে ব্যবস্থা করা হয়। যারা মাদক ব্যবসায়ী এবং ভোটে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে তাদের গ্রেফতার করা হোক। এটা সব প্রার্থীরই চাওয়া থাকে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতিতে আছে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) জায়েদুল আলম। তিনি বলেন, নির্বাচনের পরিবেশ এখন পর্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে আছে।

নির্বাচনের যে আমেজ সেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। এখন পর্যন্ত বিশৃঙ্খলা হওয়ার মতো আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।

পুলিশের চলমান অভিযান সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা পুলিশের নিয়মিত কাজ। পুলিশ সবসময় অভিযান চালায়। বিশেষ করে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী, বহিরাগত সন্ত্রাসী, বড় কোনো অপরাধী, বিভিন্ন মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়।

এটা নিয়মিত কাজের অংশ হিসাবে আমরা বিভিন্ন ওয়ার্ডে অভিযান পরিচালনা করছি। এসব অভিযানে এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকারের অভিযোগ-সরকারি দলের প্রার্থীকে সুবিধা দিতে কাজ করছে পুলিশ। তৈমুরের এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে এসপি বলেন, সাতজন মেয়র প্রার্থী এখানে নির্বাচন করছেন। তাদের মধ্যে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী এ ধরনের অভিযোগ করছেন। এটা সম্পূর্ণভাবে ভিত্তিহীন বলে আমরা মনে করি।

তিনি আরও বলেন, পুলিশ বাহিনী কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থী বা কারও পক্ষে বিপক্ষে কাজ করে না। পুলিশ বাহিনী সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ নিয়ে নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ এবং গ্রহণযোগ্য করার জন্য যা যা করণীয় সেই কাজ করে থাকে। আমরা সেই কাজ করছি।

এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের মিশনপাড়া এলাকায় চায়ের দোকানে বেশ কিছু লোকের ভিড় লক্ষ করা যায়। এ প্রতিবেদক চা-পানের লক্ষ্যে সে দোকানের এক কোনায় দাঁড়িয়ে তাদের কথা শুনছিলেন। আলোচনার বিষয় নাসিক নির্বাচন।

১৬ জানুয়ারির নির্বাচন কেমন হবে তা নিয়ে তারা হালকা তর্কে জড়িয়ে পড়েন। কেউ বলছেন, এবার নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। আবার কয়েকজন তাদের বক্তব্যের পালটা জবাব দিচ্ছেন।

বলছেন, এতদিন নির্বাচনি পরিবেশ সুষ্ঠু থাকলে সামনের দিনগুলোতে এ পরিবেশ থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যেভাবে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও বাড়ি বাড়ি তল্লাশি শুরু হয়েছে তা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হবে। শুধু মিশনপাড়া নয়, নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় চায়ের দোকান, শপিংমল, অলিগলিতেও একই আলোচনা।

এ প্রসঙ্গে তাওলাদ নামের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, আমরা চাই নারায়ণগঞ্জে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। ভোটারদের যোগ্য প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। এখন পর্যন্ত নির্বাচনি পরিবেশ ততটা খারাপ হয়েছে বলা যাবে না।

তবে সামনের দিনগুলো নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। কোনো প্রার্থীর সমর্থকদের গ্রেফতার ও তাদের বাড়ি তল্লাশি চালানো হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে পারে। তবে প্রশাসনের কাছে আমাদের অনুরোধ থাকবে তারা যেন নিরপেক্ষ আচরণ করে। এখানে যাতে নির্বাচনি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড অব্যাহত থাকে।

নাসিক নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি হাফিজুল ইসলাম বলেন, এ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে এটা আমরা বিশ্বাস করি না। অতীতের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আমাদের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, এ কমিশনের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। নাসিক নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এমন প্রত্যাশা আমাদের নেই। হয়তো লোক দেখানো নির্বাচন হতে পারে। তবে নাসিক নির্বাচন সুষ্ঠু করে নির্বাচন কমিশন শেষ সময়ে একটা প্রমাণ দিতে পারে-এমন মন্তব্য করেন হাফিজুল।

আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা : সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে চারটি মামলায় ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্ব সার্কেল) কোহিনুর আক্তার। সোমবার রাতে সিদ্ধিরগঞ্জের ১ ও ২নং ওয়ার্ডে নির্বাচনি আচরণবিধি পর্যবেক্ষণে নেমে তিনি এ জরিমানা করেন।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কোহিনুর আক্তার বলেন, ২নং ওয়ার্ডের মিজমিজি ও ১নং ওয়ার্ডের পাইনাদি এলাকায় কাউন্সিলর প্রার্থীদের পক্ষের লোকজন একাধিক মাইক ব্যবহার, নির্ধারিত মাপের চেয়ে বড় ব্যানার ও প্রতীক তৈরি, অনুমোদনহীন ক্যাম্প পরিচালনা, আলোকসজ্জাকরণ, ক্যাম্পে একাধিক সাউন্ডবক্স ব্যবহার করায় চারটি মামলায় ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

অভিযানকালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কোহিনুর আক্তার নির্বাচনের প্রচারণায় সব প্রার্থীকে আচরণবিধি মেনে চলার কঠোর নির্দেশনা দেন।

তিনি বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে আচরণবিধি যথাযথভাবে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছি। এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আচরণবিধিমালায় যা যা আছে তার ব্যত্যয় হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

six + fourteen =